একজন নীহারবানুর উপাখ্যান

‘নীহারবানু ও বানু আপনে কি করতেছেন?
গায়েবি আওয়াজ ভাসে বাতাসে।
মনমহলে ঘুরত্যাছি পয় পরিষ্কার হাওয়া খাইত্যাছি আর বুঝলেন কিনা এইটা আমার নিজস্ব রাজমহল। এইহানে বেশুমার মনপুরানি বাতাসের মধ্যে কি সোন্দর বৃক্ষলতার সুবাস, স্বর্ণচম্বার সুবাস, বেল চামেলার সুবাস রাত কা রানির সুবাসÑ কি কব এহেবারে দিলকোশ দিলদরদি হাওয়ামহল। এই রাজত্বিতে মানুষের মনে হাহাজার নাইক্কাÑ কেউ কাররু কলজায় খাবলা মারে না।সত্য নারীর ইজ্জত নিয়া কোনো শয়তানের বাচ্চা খেলা করলে এ মনমহলে তারে আমি ছরাছল ফাঁসিতে চড়াই। এইটাই হইল গিয়া নারীরাজ্য, শান্তিরাজ্য। আপন গুণগান এমন বয়ান করা আমার ধাতে নাইÑ তবু এটটু চিন পরিচয় দরহার মনে কইরলাম। আইজকাইল নাহি আপন চিন পরিচয় আপনি গলা বাজাইয়া দিতে হয়। না হইলে কেউ চক্ষু খুলে না। আপন বাদ্যও নাকি আপনি বাজাইতে হয়। তাই…
নীহারবানু শান্ত অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে কথাগুলো আউড়ে যায়, বাক্যবিন্যাস শেষ করে এবার বানু মুদ্র ছন্দদোলায় দুলতে থাকে। মনে হয় আপন চৈতন্যের সুগন্ধে সে বিভোর। সে এক অসাধারণ মানবী যেন। মনমহলে এরকম নিভৃতখোলা তার নিত্যদিনের। এ নারীরাজ্যে যতক্ষণ সে আছে ততক্ষণ মুখে রাজ্যেল কথা মঞ্জুরী। জয়যুক্ত প্রজ্ঞাসুন্দরী সে।
আর বাদবাকি সময়?
সেইটাই এক আশ্চর্য ঘটনা। বাদবাকি সময় নীহার মুদৃবাক আত্মগ্ন এক মধ্যবয়সী রাঁধুনী। স্রেফ পাচিকাÑ গুলশানের পাকশালায় তার সুর্যোদয় সূর্যাস্ত।
এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নলোকের চাবি তার মুঠোর অধিকারে। অতিচেতনার রাজ্যে সে মুহূর্তে পৌঁছে যেতে পারে সেই মনমহলে।
একটু দম আটাকা দম আটকা বোধ হইলেই হৃদয়পুরের হাওয়ায় সে ভাসিয়ে দেয় ডুরি ডুরি শাড়ির আটপৌরে আঁচল। শুধু স্টোররুমের দরজা ভেজিয়ে পদ্মাসনে বসতে হয় তার, লম্বা দম টেনে টেনে নিজস্ব কিছু শব্দ একধ্যানে আওড়াতে আওড়াতে সে মহানন্দে পৌঁছে যায় আনন্দমহলে। সে ছোঁয় তার আঙুলের ডগা। দেহখানা থাকুক পড়ে পোড়া সংসারে, সে তখন নারীরাজ্যের এক মুক্তমানবী।
হায় মরি কি শোভাÑ কি শীতল বাসাত মনমহলে। পুষ্পভারে আনত কাননবীথি। দীঘিতে নীলকমল। কি রূপ কি সুরেলা কণ্ঠ ঐসব পক্ষীকুলের। শ্বেতপাথরের মেঝে মখমল আঁটা আবলুস কাষ্ঠের কেদারা। ঐটিই তো প্রকৃতি সুন্দরী বানুবেগমের সিংহাসান, পিলসুজে বাহারী দীপাবলী… পুরা মালিকানা বানুর। সোনার অক্ষরে লেখঅ দলির দস্তাবেজ… কোনই ঝুট ঝামেলা নাই।
আজ বুঝি কিচেনে বহুত ধুমধাম। মোরগ পোলাও আর লাউয়ের পায়েসÑ দুধলাউ। অতিথি মেহমান আসবে। বেগমসাব রূপচর্চা করতে গেছেন। যেটুকু রূপ আছে তাও ঘষে ঘষে রূপের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে।
হয়তো পাঠক ভেবে নিয়েছেন নীহারবানুর শিক্ষা-দীক্ষা তেমন নাই, গাইয়া মেয়ে-ছেলের মতো ঘুরিয়ে পেূঁচিয়ে শাড়ি পরে। সে তো নেহায়েত সাদাসাপটা এক বুয়া বিশেষ।
ধারণা ষোলআনাই ভুল বলা যায়। সে মাহামহীর কাছ থেকে কিছু বিরল সাধন ভজন আয়ত্ত করেছে। সে পেতার কাছে কিছু বিদ্যার্জন করেছে। তার জ্ঞানস্পৃহা তীব্র, তার শুভ চৈতন্যের মাজেজা খুব কম মানুষেই বুঝতে পারে। তার ভেতর আল­াহ পাক কি জানি এক ফোঁটা তেজ পুরে দিয়েছেন।
জীবনবন্ধী পুষ্পমাল্য অষ্টপ্রহর তার গলায় দোলে। ুবঝিবা সে এক প্রাচীন নারী নয়তো ভবিষ্যতের কিংবা গাঢ় বর্তমানের বা চিত্রাকলস্পর্শ করা এক সম্পন্ন সত্তা। হয়তো ছিটকে পড়ে আছে এই সময়ের এক বিত্তবানের চকচকে কিচেনের ভুল ঠিকানায়।
অবশ্য মনমহলে সে এক পরিপূর্ণ নারীসত্তা। ব্যকিত্তে¡র স্ফুলিঙ্গে উদ্ভাষিত। সে নিপুণ গৌরবে স্বশিক্ষার কল্যাণী আলোর অপরূপ।
নারীদের নিষ্পেষণ, নারীদের নিজেদের মর্যাদাবোধ আকার, পণ্য সাজার নির্লজ্জ বাসনা এবং পুরুষের সূ² জাল এসবই নীহারবানুর মগজে দাহ তৈরি করে।
অনেক নারীর সঙ্গে সৌজন্যে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ সে করে বরাবর। ভাবের আদান প্রদান। শুভচিন্তার আদানপ্রদান, নইলে মঙ্গল নাই। নীহার খনার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় মুখর হয়। তাকে অনেক কিছু জানতে হবে। জীবনের সব মঙ্গল-অমঙ্গল। কখনো সেবার রানি বা চাঁদ সুলতানার সঙ্গে বসে সুগন্ধী তাম্বুল রসে কণ্ঠনারী ভিজিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপে মগ্ন হয়ে পড়ে। মাঝে মধ্যে নাকি বেগম রোকেয়াও স্বপ্নযানের কপাট খুলে নেমে পড়েন নীহারবানুর মনোরাজ্যে।
নীহার আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে বিনীত ভঙ্গিতে বলেÑ
‘রোকেয়া বাবু আপনে আমার কতবড় সম্মানের মানুষ তা আমার এ বেকুব অন্তর জানে। বুবু এই পোড়াদেশে মেয়েদের মানুষ হবার কথা আপনিই প্রথম জানাইলেন। কত যুদ্ধই না করলেন বুবু। তাও বাবু কি কবর দুঃখের কতা এহনও মেয়েমানুষ লেহাপড়া শিখ্যা সত্যিকারের মানুষ হয় না? কেন? নিজেরে নিজে ছোট করে। অপমান গায়ে মাখে না। হায়রে বাঙালি নারীজাত। পাত্থর যেন, সেই পাত্থরে জমেছে অযুতনিযুত বছরে শেওলা। আমার এক এক সময় কান্দন আসে। একলা মনে কান্দি। আমি এক তুচ্ছ মানুষ তাও যে মাথাডায় হাজার বজ্রপাত। কত যে সম্ভব অসম্ভব স্বপ্ন দেহি দিবারাত্রি। আর এক কতা এহনও মেয়েমহলের এক জবান পুরুষমানুষে সম অধিকার দেয় নাÑ কেবল ঘুরপ্যাঁচ মারে। আরে তেনারা দিব কি? তেনারেতো ছয় রিপুর হাতের পুতলা। দিনের আলোয় চোখ অন্ধকার দেহে। তেনারা তে অসুখখ্যা জাত। হাতে গণা ভালোমানুলের কথা বাদ দিলে। বুবু, মগজে কুলায় না তবু বড় বড় ভাবনা মাথার মধ্যে। মাফ করবেন। নিজগুণে ক্ষমা দিয়েন বুজি।’
নীহার অচেনা আনন্দ বেদনায় কাঁপতে থাকে। মুদৃজ্বরভাব হয়।
বানু ও নীহার বানু। তুমি কে বলতা?
বাতাসে বেশুমার ফুরের সুবাস। গায়েবি আওযাজভাসে পাক খেয়ে খেয়ে। এ প্রশ্ন কে করে নীহারের অবচেতন মন কি? কে জানে। কে এই নীহার বানু?
হয়তো মুঘল সাম্রাজ্যের কোনো বাদশাহের খাস পাচিকা অথবা আরো পেছনে বহু প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের এক সুশিশিক্ষত প্রজ্ঞাসুন্দরী।
হয়তো সে আর কিছুই নয় শুধু এক পুঁথিপাঠক বা স্বভাবকবির প্রথমা কন্যারতœ। শিশু বয়স অতিক্রম করেছে কাঞ্চনমালা ডালিমকুমার সাইফুলমূলক বদিউজ্জামান বেহুলা লখিন্দারের কেচ্ছা-কাহিনীর অবিনাশী বৈভবের স্বপ্ন-জোনাক ফোটা এক অলীক বাগানে।
বানু ইতিহাসে শিক্ষা পেল কোন সুবাদে? যে নারী অদম্য জ্ঞান স্পৃহা নিয়ে জন্মায় সে বুঝি পেয়ে যায় তার গুরু। হয়তো সে বিবেক বুদ্ধির অতিস্বচ্ছ চৈতন্যে ইতিহাসেরও খানিক প্রতিচ্ছবি কিছু প্রিয় চরিত্র ছায়বাজির মতো দেখতে পায়।
নীহারবানুর নাকি মাঝেমধ্যে অতিভ্রম ঘটে। মেয়েলোকটার খারাপ জ্বিনের আছর আছে। বাবুর্চি মুবারক মিয়া এইসব সারসত্য কায়দা করে শুনিয়ে রাখে বেগম সাহেবাকে।
একই ছাদের তলায় তারা দিবানিশি রন্ধনকাজ করে। একটু হাস্যরস বিনিময় এই বেটের সঙ্গে সম্ভব নয়। তাতে করে মুরাবক মিয়ার পিত্তপীড়া চং করে চাঁদিতে চড়ে যায়। ঘাড় মস্তক বরাবর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। রাগে গোস্যায় পেটের ভেতর বহুত গবর গবর করতে থাকে।
মেয়েলোকের আবার মারফতী! তাও আবার রান্ধনীবেটের। এ যাবত যতজন মেয়েলোকের সঙ্গে পাকশালায় বৃন্দাবন সাজিয়েছে মুবারক হাতে করে তার নাম শ্রীকৃষ্ণ ঠাকুরের পরেই উচ্চারণ করা যায় বুঝি। অথচ এই এক ভাবের রসে ফুলুঢুলু অন্যরকম বেঢপ মানুষ। রঙ্গতামাশালার কেরামতি বোঝে না। বেয়াদপ কিসিমের মানুষ। মাটির চাক্কা বরাবর। আবার ত্যাজ আছে মেয়েলোকটার। গায়ে একটু ধাক্কা লাগলেও ফোঁস করে ওঠে।
কে বোঝে বানুকে? কার সাধ্যি? সে চক্ষু মুদলে হাজার বছরের পুরানা বাংলাভূমির আদিরূপ দেখে। শক্তিময়ী নারী রূপ দেখেÑ কব্জিতে তার বিদ্যুৎশক্তি। মনময় জীবনের গীতমালা। সে নারীর অন্তরে রহস্যময় মহাজীবনের অসংখ্য পদ্মফুলের বীজ সংরক্ষিত।
উৎকণ্ঠায় গলায় শুকায় বানুর। সংসার কোন দিকে গড়াচ্ছে জীবনে এত জট। বাজারে আগুন। পোড়াদেশের কিলবিল করা মানুষের কি গতি হবে অতঃপর। হয়তো সামনে একটা ভালো দিন আসবে। নারীসমাজ হাল ধরবে এ হালকালা সংসারের। আশালতায় ফুল ফুটবে কবে? কতদিনে! বানুর কপালের শিরা দপ্ দপ্ করে।
আজও তো মেয়েমানুষের মানমর্যাদা বারবার তলিয়ে যায়। হায় তারা কি চিরকাল চিনির মোরবক্ষা হয়ে বোয়ামে সংরক্ষিত থাকবে? খোলা আলো-বাতাসে রাখলেই ডাইপিঁপড়া বাগডাঁসা খুলবে খাবে? পোড়াদেশে খ্যাপা জানোয়ারের সংখ্যা এত বেড়ে গেল কি করে। ওদের বিষ প্রয়োগে নিধন করা দরকার।
আর পারা যায় না। কে যেন বানুর পরানের ভেতর ফিস ফিস করে… চল কন্যে মনমহলে একটু জিরিয়ে নাও। দুধলাউ নিয়ে এত ব্যস্ত হতে হবে না। সময়মতো সব তৈরি হয়ে যাবে। তোমার হাত দুটো তো মেশিন।
নীহারের ঘর সেই যে ভাঙল জীবনে আর কাউকে সে ঠাঁই দিল না। নরকের কীট তো তার দোসর হতে পারে না আর। সে যে জন্মাবধি এক অপাপবিদ্ধ মেয়ে। বয়স বোধকরি চলি­শ ছুঁই ছুঁই। সাধুসংকল্পেরাই সময় বটে।
তুব আর কি সাধ নেই তো?
বানু আপনমনে হাসে।
আর কতদিন বাঁচতে হবে?
এই প্রশ্নও বানুর প্রাণের ভেতর প্রায়শই উথলায়। প্রাশয়ই।
ধরে রাখো আরও চলি­শ বছর।
গায়েবি আওযাজ ভাসে বাতাসে যেন।
হুইন না… নাহ…
প্রবল প্রতিবাদের ভাষায় সুফিভাবে ভরা মস্ত সঞ্চালন করে সে।
অত লম্বা সময় এ কয়লা সংসারে মন বাঁচবে না।
ভবিতব্য এবার মহাখাপ্পা।
আচ্ছা বানু তুমি এমন সকাল সকাল ছুটি চাও কেন? তোমার তো মাথাগরম ব্যাধি ছাড়া আর কোনো ব্যাধির সংবাদ পাই নাই। কেবল পেঁপে ঘণ্ট, শাকচচ্চরি খেতে চাও খাও, তবে মাধ্যে মধ্যে গোশত মাছ খেতে হয়। সাজ পোশাকও একটু লাগে জীবনে। একটু আধটু বাসনা কি থাকতে নেই? মানবজন্ম বলে কথা!
আরে থুঃ। মনমহলে তো আমি ঢাকাই মসলিন দিয়ে ঘোমটা দিই। ফলের শরবত চুমুকে চুমুকে খাই। কিন্তু এই পাকশালায় আমি চির বৈষ্ণবী। ঐ মুবারকের জন্যে সাজ। থুঃ থুঃ নরকের কীট। পাপের পাহাড় একটা। একশ’ একটা মেয়ে মানুষ ওর সখি। ওয়াক থুঃ। সর্বশিরায় আমার ঘিন্না কিলবিল করে।
আচ্ছা বানু কাহার সনে বাক্যালাপ করে?
কেন ভবিতব্য? না কি তার অবচেতন মন?
না না শূন্যকণ্ঠ ছায়া নয়। ভাবের মানুষÑ মানসকুর্মা স্বপ্নভ্রমণে দেখা হয়… বুঝি ভালোমন্দের গুরু মানে তাকে বানু। নগরবাউল। কোন অলিগলি এডিনিউয়ে গঞ্জে মাঠে, আইলের ধার ঘেঁষে বা ছেঁউড়িযঅযার বাউলকুঞ্জে সে নেই। আছে বানুর চোখের তারায়। সদা হাসিমুখ। কণ্ঠার হারের উপর বনফুলের মালিকা।
কবিয়াল পিতার সয়-সম্পত্তি সবই তো থাবা মেরে খুবলে নিয়েছে পাঁচ ভাইবোন। একরুত্তি চিত্তদাহ হয় নাই র্তা
শাব্বাস কন্যে মুক্তবালিকা পদ্মিনী নারী-বিষয় আশয়ে দুর্গন্ধ। তোমাকে জয়মান্য পরাই পদযুগলে চন্দন প্রলেপ।
সেদিন মনমহলে অবাক উৎসব। নগর বাউল কতরাত গবীর নাগাদ গাইলেন নীহার প্রশান্তি। শুনে লজ্জায় কুঁকড়ে যায় কন্যে। বাউলের স্বকণ্ঠে গীতসঙ্গীত। কি শক্তি বানু উপেক্ষা করে পাকশালায় মোরব্বা কাচায়।
এদিকে বেগম সাহেবার মেজাজ হঠাৎ হঠাৎ তিরিক্ষি হয়ে যায়। ঝনাৎ বাক্যবিন্যাস করতে থাকেন বেশুমার। তিনি তো জানেন না নীহারবানু কোনো রাজ্যের সম্রাজ্ঞী। তিনি শুধু জানেন জ্বিনে ধরা মেইডটি কর্মে ভালো কিন্তু ধর্মে পুরা পাগল।
বাবুর্চি মুবারকের রেকর্ড খারাপ। কিচেনের সব মেয়েগুলো বড় জোর এক বছর টেকে। নানান ঝুট ঝামেলা শুরু হয়ে যায। ঘাড় ধরে অগত্যা মেয়েলোকটিকেই বিদেয় করা হয়। কোনোরকম বিচার আচার ছাড়াই। মুবারককে ছাঁটাই করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। সে বিনে কিচেন প্রায় অচল।
নীহার সম্পর্কে রিপোর্ট আসে। সে নাকি আবার একামনে কাব্য রচনাও করে। সর্বদা মারফতী তরিকায় বাক্য বানায়। আর মুহূর্তে চোখ বুঁজে বিড় বিড় করতে করতে ভাবের রাজ্যে লীন হয়ে যায়।
বানু সযতেœ দুধলাউ রন্ধন করে। এ সময় সবটুকু মনোযোগ সে ঢেলে দেয় কাজে। অতঃপর দুধলাউ খেয়ে অতিথ মেহমান দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য। অনেকেই শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি গন্ধ শোঁকে। নস্টালজিয়ার হু-হু হাওয়া দুলে দুলে ফুলে ফুলে ওঠে। পুরানো দিনের হুতাশে মৃদু কম্পন।
বারবার আসব এমন মিষ্টান্ন খেতে রসনা ধন্য করতে। সমস্বরে ওরা যেন গান গেয়ে ওঠে।
বেগম বিগলিত।
এ আর এমন কি! হরহামেশাই করছি। তবু খুব আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে এই ক্ষীরলাউয়ের কল্যাণে আপনাদের মহাশূন্য শৈশবস্মৃতি জাগ্রত হয়েছে। একদিন আপনাদের নানা পদের পুলি পিঠা খাওয়ানোর সাধ আছে।
ওহ গ্রেট। মিসেস ভাণ্ডারিয়ার তুলনা নেই।
সমস্বরে জয়ধ্বনি ওঠে যেন।
কপাটের এ পারে নীহার। সে কয়েক পদের পুরভরা পুলি বানিয়ে খাইয়েছিল দিন সাতেক আগে। বেগম তো তার কোনো কায়দাই জানেন না। কেবল স্বাদ মজাদার হলে আরো দুটো তিনটে মুখে পুরে দেন। বাহবাও জানান বৈকি, একটু কৃপণভাবে। তবুও বলেছিলেন, ‘থ্যাঙ্ক ইয়ু ভেরি মাচ’। ওটুকু মনে আছে বানুর। হাসি চাপে একা একা।
একজন নবীনা সহর্ষে বলে ওঠেÑ
দুধলাউয়ের রেসিপিটা একদিন হাতে-কলমে দেখে নেব কিন্তু। ঘাড় ঝাঁকিয়ে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনেন বেগম ভাণ্ডারিয়া।
আমি একদিন ডাকব বৈকি।
তখনও ক্রিস্টালের বাটি চামকে সিম্ফনি বাজে। আর এহেন রন্ধন নৈপুণ্যের জন্যে দিলরুবা ভাণ্ডারিয়াকে ‘অকথ্য’ প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন চাটুশিল্পীর দল। বেগম খুশিতে লাল বেদানা হয়ে দুলতে থাকেন। কপাটের আড়ালে বুক ধড়ফড় করে বানুর। মোহমিথ্যার বেঘোর জগত কি দুনিয়াশুদ্ধ। বানুর আকুপাকু ঠেকে। বিবমিষা বোধ হয়।
আর দেরি সয় না। অবিলম্বে নীহার অলীক পেখম মেলে দেয়। মনমহলে শান্তহালে সে নগরবাউরের সমীপে উপস্থিত হয়। সকল বৃত্তান্ত খুলে বলে বানু। ঐ দুধক্ষীরের ভুল প্রশংসার বিষয়টিও। বাউল একসময় উদাস কণ্টে বলে ওঠেনÑ
হায় এ আর কি… কত কত ফাঁকি মানুষকে অন্তরে ধারণ করতে হয়। বিশেষতঃ মেয়ে জাতকে।
নীহার নুয়ে পড়া স্বরে বলে।
আর কতদিন বাঁচতে হবে বাউল?
নির্জ্ঞানের মতো প্রশ্ন মুক্তমালিকা? মানবজনম কি কম কথা?
ঝাঁজ ঝরে বাউলের বাক্যে?
নীহারের সমস্ত অস্তিত্বে যেন বিস্ফোলন ঘটে। জেগে ওঠে অন্তর, নতুন বেদনায়। প্রবল সাধ জাগে সে বেরিয়ে পড়বে বিশ্বযাত্রায়, অনিঃশেষ অন্বেষণে, নারী জন্মের জয়গান গাইতে গাইতে।
আর যদি নগরবাউল সত্যি সত্যি মনোরাজ্য ছেড়ে দেখা দেয় এই সংসারের মাটিতে। তবে… শিউরে ওঠে নীর্হা
যদি বা একলা চলতে হয়, ভালো মন্দের সমব্যথী হবে কে?
যদিবা কেউ না হয় তবে নীহার একই চলতে জানে। সে নিজেই হবে নিজের গুরু

লেখকঃ

দিলারা মেসবাহ