জীবনবেলা

বেডরুম থেকে বেরিয়েই বড়মেয়েকে দেখতে পেলেন মোমেন সাহেব। ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে নিঃশব্দ হাসি। বেশ অনেক দিন পর এরকম সকালবেলা মেয়ের মুখটা তিনি দেখলেন। এমনিতেই তাঁর মন আজ ভাল। চার বছর পর প্রিয়বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে। মেয়েকে দেখে ভাল মন আরও ভাল হয়ে গেল। ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। কী মা! তুমি এত সকালবেলা!
মেয়েও জড়িয়ে ধরল বাবাকে। অনেক সকালে ঘুম ভেঙেছে বাবা। পিচ্চি তো সারারাত ঘুমায় না! থাকে আমার শাশুড়ির কাছে। শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই নাতনি নিয়ে সারারাত জেগে থাকে। সকালের দিকে তিনজনে মিলে ঘুমায়। আমি আর নাবিল তখন জাগি।
তুই জয়েন করবি কবে?
এই তো উনিশ তারিখে, বাবা।
ছয় মাস পার হয়ে গেল?
হ্যাঁ বাবা। একদম চোখের পলকে। মেটারনিটি লিভ একবছর হওয়া উচিত।
একবছর হলেও মনে হবে চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল।
মোমেন সাহেবের স্ত্রী কেয়া ছিলেন কিচেনের দিকে। ডাইনিং স্পেসে এসে বড়মেয়েকে দেখে তাঁর মুখও উজ্জ্বল হল। তাই তো বলি! আমার বড়কুর গলা শুনছি!
বড়মেয়ের নাম শৈলি। কেয়া ডাকেন বড়কু। ছোটমেয়ে শ্রেয়াকে ডাকেন ছটকু। কিন্তু নাতনিকে না দেখে তিনি অবাক। আমার ছোট্ট পরিটা কই? তাকে আনিসনি?
না মা। ঘুমাচ্ছে। আমাকে নামিয়ে দিয়ে নাবিল চলে গেল ইউনিভার্সিটিতে।
ইস ছেলেটার খুব কষ্ট। শুক্রবারও ক্লাস নিতে হয়।
ও কিন্তু এনজয়ই করে। এমবিএ’র ক্লাস নেয় শুক্রবারে। ছাত্ররা প্রত্যেকেই নাকি ওরচে’ বড়।
শৈলি নর্থসাউথ থেকে এমবিএ করার পর বিয়ে করল। নাবিল তখন ক্যালিফোর্নিয়ায়। শৈলিও চলে গেল। সেখানে গিয়ে আরেকটা এমবিএ করল। তারপর হঠাৎ করেই দেশে ফিরে এল। আমেরিকায় ভাল লাগে না। নাবিল বহু বছর ধরে আমেরিকায়। ওখান থেকেই পড়াশুনা। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। মা বাবার একমাত্র ছেলে। শৈলির শ্বশুর শাশুড়ি বছরে ছ’মাস আমেরিকায়, ছ’মাস দেশে। ছেলে ছেলের বউ ফিরে আসায় তাঁরাও খুশি।
এসব বছর দুয়েক আগের কথা।
নাবিল ব্রাইট ক্যারিয়ারের ছেলে। খুবই নামকরা একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তাকে ডেকে নিল। শৈলির চাকরি হয়ে গেল ব্যাংকে। পাঁচমাস আগে সংসারে এসেছে কন্যা। বাচ্চাটা একদম শৈলির কপি। নাতনীর মুখের দিকে তাকালে পাঁচমাসের শৈলিকেই যেন দেখতে পান মোমেন সাহেব আর কেয়া।
মাকে দেখে বাবাকে ছাড়ল শৈলি। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল কেয়াকে। একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে অন্যহাতে মেয়ের মুখ মাথা হাতাতে লাগলেন কেয়া। যেন এখনও মেয়ে তাঁদের সেই ছোট্টটি রয়ে গেছে। সেভাবেই আদর করতে লাগলেন।
শৈলি বলল, সকালবেলা উঠেই তোমাদের দেখতে ইচ্ছে করলো আম্মু। নাবিলকে বললাম, আমাকে নামিয়ে দিয়ে যাও। পিচ্চির কথা মনেই হল না।
কী যে বলিস!
হ্যাঁ আম্মু। আমার শাশুড়িই তো চব্বিশ ঘণ্টা দেখছে ওকে। আমি মাঝে মাঝে ভুলেই যাই যে আমার একটা মেয়ে আছে!
মোমেন সাহেব বললেন, নাশতা করেছ মা?
না বাবা। আম্মু, বিক্রমপুরের ওই ঘি আছে না?
থাকবে না কেন? গত সপ্তাহে দুই কেজি আনিয়েছি।
বুয়াকে বলো ওই ঘি দিয়ে পরোটা ভেজে দিতে, সুজির হালুয়া বানিয়ে দিতে। নাবিল ক্লাস শেষ করে আসবে। দুপুরে পোলাও আর মুরগির রোস্ট করতে বলো। নূরজাহান বুয়ার হাতের রান্না নাবিল খুবই পছন্দ করে।
সব হবে। কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু তোর বাবা থাকছেন না।
কোথায় যাচ্ছে?
মোমেন সাহেব বললেন, আমি যাবো ভালুকার ওইদিকে। গ্রামের নাম পাড়াগাঁও।
ওখানে কার কাছে যাচ্ছো?
আমার বন্ধু। মকবুলের বাড়িতে।
মকবুল আংকেল! তোমার সেই বন্ধু! তোমাদের জন্ম একই তারিখে, বিয়ে এবং চাকির একই তারিখে!
মোমেন সাহেব হাসলেন। হ্যাঁ মা। সেই মকবুল। বছর চারেক মকবুলের সঙ্গে দেখা হয় না। ফোনে মাঝে মাঝে কথা হয়। পরশুদিন ফোন করে বলল, আয়, একটা দিন আমার সঙ্গে কাটিয়ে যা। তোর সঙ্গে একটু কথাও আছে। ফোনে বলা যাবে না।
মকবুল আংকেল এখন কী করেন?
কিছুই না। বিঘা তিরিশেক জমি ছিল পাড়াগাঁয়ে। ওদিকটায় ওর শ্বশুরবাড়ি। একেবারেই হেলাফেলার জায়গা। পানির দামে এক দুবিঘা করে কিনেছিল। সেই জমি এখন সোনার খনি। বিশ বিঘা বিক্রি করে চারকোটি টাকা পেয়েছিল। সেই টাকার কোটিখানেক খরচা করে দুটো বড় কাজ করেছে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছে আর একটা বাড়ি করেছে। পুকুর বাগান গাছপালা, কিছু ধানীজমি মিলিয়ে বিঘা দশেক জমি আছে এখন। মেয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ায়। মেয়ে মেয়ের জামাই দুজনেই ফার্মাসিস্ট। খুবই ভাল আছে ওরা। মকবুল আর তার বউ বছর দেড়েক আগে সিডনিতে গিয়ে মাস চারেক মেয়ের কাছে ছিল। সেখান থেকে মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে বলতো, একদম ভাল লাগে না। নির্জন নিরিবিলি একঘেয়ে জীবন। বিদেশে মানুষ থাকে!
ঠিকই বলেছেন। আমারও খুব একঘেয়ে লাগতো। এজন্যই চলে এসেছি। নিজের দেশে কম খেয়ে থাকাও ভাল। মা বাবা ভাই বোনের কাছে থাকলাম। আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের কাছে থাকলাম। এই যে ধরো ইচ্ছে হল সকালবেলা বাবা মাকে দেখবো, হুট করে চলে এলাম। এই জীবন বিদেশে সম্ভব না।
সবকিছু মিলিয়ে খুবই ভাল আছে মকবুল। কোটি তিনেক টাকা আছে ব্যাংকে। ওই টাকার ইন্টারেস্ট দিয়ে রাজার মতো জীবন কাটায়। দুজন মানুষের সংসার। নিজের জমির ধান, বাগানের শাক সবজি ফল, গরু পালে কয়েকটা, সেগুলোর দুধ, পুকুরের মাছ। সবই খাঁটি। ফর্মালিন ইত্যাদির সমস্যা নেই। মেয়েও কখনও কখনও টাকা পাঠায়। মকবুলের দরকার হয় না, তাও দায়িত্ব হিসেবে মেয়ে পাঠায়। সে আছে বেশ। আমরা একসঙ্গে কলেজের চাকরিতে ঢুকেছিলাম। দুজনেরই পোস্টিং হল ফুলপুর সরকারি কলেজে। সেখান থেকে পরে দুজন বিছিন্ন হলাম। আমি চলে এলাম শিক্ষা ভবনে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নানারকম প্রজেক্টের দায়িত্ব মহাব্যস্ত জীবন। মকবুল এ কলেজ ও কলেজ ঘুরে ক্লান্ত। বছর সাতেক আগে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে ছিল। একদিন আমাকে ফোন করে বলল, চাকরি ছেড়ে দিলাম রে মোমেন। আর ভাল লাগছে না।
তার মানে ততোদিনে জমি বিক্রির টাকা হাতে এসেছে!
হ্যাঁ। বাড়ি করা, মেয়ের বিয়ে দেয়া, ধামাধাম সেরে ফেলল। একটাই তো মেয়ে। মেয়েটা তোর চে’ এক বছরের বড়। তুই হলি আমাদের বিয়ের তিন বছর পর। মকবুলের মেয়েটা জন্মালো দুবছর পর।
তা জানি বাবা। মকবুল আংকেলের মেয়ের নাম ঈশিতা। আমি ঈশিতা আপু ডাকি।
কেয়া কিচেনে গিয়ে পরোটা হালুয়ার কথা বলে এসেছেন। বাপ মেয়ের শেষ দিককার কথা শুনে বললেন, মকবুল ভাইর অবস্থা আমাদের চেয়ে অনেক ভাল। ব্যাংকে নগদ টাকা আছে তিনকোটি। তোর বাবার নেই এককোটিও।
শৈলি বলল, টাকা না থাক, এ্যসেট আছে। গেণ্ডারিয়ায় সাততলা বাড়ি। মগবাজারে তিনটা ফ্ল্যাট। বিক্রমপুরে তোমার দশ বিঘা জমি। পদ্মা ব্রিজ হচ্ছে। ওই জমির ভ্যালু জানো? গেণ্ডারিয়ার বাড়ির ভাড়া দিয়েই তো তুমি দারুণ চলছো!
চোখ ডলতে ডলতে এসময় নিজের রুম থেকে বেরোলো শ্রেয়া। এসেই বোনকে জড়িয়ে ধরল। দুবোনের বয়সের ব্যবধান পাঁচ বছর। তার পরও গভীর বন্ধুত্ব। শুক্রবার এত সকালে ওঠার কথা না শ্রেয়ার। বোনের আওয়াজ পেয়ে উঠেছে।
এসে পড়েছিস?
শৈলি হাসল। হ্যাঁ।
আমি ভেবেছি আরেকটু পড়ে আসবি।
মোমেন সাহেব এবং কেয়া দুজনেই অবাক। কেয়া বললেন, তুই জানতি?
হ্যাঁ। কাল রাতেই কথা হয়েছে। বাবাকে আর তোমাকে বলতে মানা করেছিল আপু। সারপ্রাইজ।
মোমেন সাহেব বললেন, ও তাহলে এই কাণ্ড!
দুমেয়ে হাসতে লাগল।
এবার শৈলির শেষ দিককার কথার রেশ ধরল শ্রেয়া। সে একটু মজাদার ভঙ্গিতে কথা বলে। খুব স্ট্রেট ফরোয়ার্ড টাইপ। রাখঢাক কম। বলল, বাবা, তোমাদের টাকা পয়সা আর এ্যসেটের কথা শুনছিলাম। বাংলাসাহিত্যে পাস করা লোক। প্রথম জীবনে সরকারি কলেজের লেকচারার। তারপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এত টাকা পয়সা জায়গা সম্পত্তি কেমন করে করলে? ঘুষ খেতে নাকি?
মোমেন সাহেব হাসলেন। না, তা কখনও খাইনি। আমার ইতিহাস তোরা জানিস। তোর মা আর আমি তোদের জন্য কী কষ্ট করেছি, ভাবতেও পারবি না। একটা একটা করে পয়সা জমিয়েছি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রজেক্টগুলোতে থাকতে পারতাম বলে কিছু বাড়তি রোজগার হতো। গেণ্ডারিয়ার জমি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। বিক্রমপুরের জমি তোর মায়ের। বাপের বাড়ি থেকে পেয়েছে।
তার পরও তিনটা ফ্ল্যাট কিনেছো তুমি! সাততলা বাড়ি তুলেছো!
লোন আছে না? এখনও লোনের কিস্তি শোধ করছি।
আর ওই যে নগদ টাকা! কোটিখানেক!
রিটায়ারম্যান্টের টাকা পেয়েছি না? শৈলির বিয়ে দিয়েছি। আর এক সেমিস্টার পর তোর বিবিএ শেষ হবে। বিয়ে দিয়ে তোকে পাঠাবো মাস্টার্স করতে আমেরিকায়। টাকা লাগবে না? ওই জন্য সব গুছিয়েছি। এখনও আমি বসে থাকি না। কনসালটেন্সি করি। টাকা পয়সা এখনও ভালই কামাই। তিন ফ্ল্যাট তোদের তিন ভাইবোনের… …
মোমেন সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই শৈলি বলল, কিন্তু আমার ভাইটি কোথায়? আমরা সবাই এখানে, ও কি আওয়াজ পাচ্ছে না? উঠছে না কেন?
শ্রেয়া বলল, বাবার শেষ বয়সের ছেলে। আল­াদ বেশি। ছুটির দিনে বারোটা পর্যন্ত ঘুমায়।
মোমেন সাহেবের ছেলের নাম সংযুক্ত। শ্রেয়ার সঙ্গে বয়সের ব্যবধান অনেক। সংযুক্ত এখন তেরো। লম্বা সুন্দর স্বাস্থ্যবান কিশোর। বাবা মা’র চেয়েও বোনদের বেশি ভক্ত। স্কলাসটিকায় পড়ে। সারাক্ষণ কম্পিউটার নিয়ে আছে, ভিডিও গেমস নিয়ে আছে। ওই জিনিসের নেশা হয়ে গেছে। নিশ্চয় আজ স্কুল নেই দেখে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ওসব করেছে। এজন্য উঠতে পারছে না।
কেয়া বললেন, ওর এই গেমসের নেশাটা ছাড়াতে হবে। খুবই বাড়াবাড়ি করছে।
শৈলি বলল, তা আমরাও করেছি আম্মু। আমার ছিল কমিকস পড়ার নেশা। সেজন্য কম বকা খেয়েছি তোমার কাছে!
শ্রেয়া বলল, আমি তেমন বকা খাইনি। কারণ আমি তো গল্পের বই পড়তাম।
না, তুই কার্টুন দেখতি। মিনা কার্টুনের মুরগিটা চোরে নিয়ে যাচ্ছে দেখলেই ভেউ করে কেঁদে ফেলতি। এজন্য আম্মু তোকে বকতো না।
মোমেন সাহেব কেয়ার দিকে তাকালেন। নাশতা রেডি করো। আমি গোসল সেরে বেরোই। সকাল সকাল রওনা দিই। শুক্রবার রাস্তাঘাট খালি পাবো। দুআড়াই ঘণ্টার মধ্যে চলে যাবো।
কেয়া বললেন, ফিরবে কখন?
বিকালের দিকে রওনা দেবো। ফিরতে সাতটা সাড়ে সাতটা।
শৈলি বলল, ডায়াবিটিসের ওষুধ খেয়েছ, বাবা?
মোমেন সাহেব কথা বলবার আগেই কেয়া বললেন, ওষুধ খেতে তোর বাবার ভুল হয় না। একদম টাইম ধরে ওষুধ খায়। নাশতার আধাঘণ্টা আগে হাফ এমারিল, দশ মিনিট আগে গ্যালভাস। খাওয়ার পর এমডোকল। ওটা প্রেসারের ওষুধ।
শৈলি তী² চোখে মোমেন সাহেবের মুখের দিকে তাকাল। বাবাকে ফ্রেস লাগছে। মাঝখানে শরীর একটু ভেঙেছিল। আজ ভাল লাগছে।
মাঝখানে ঘুম কমে গিয়েছিল মা। তোরা গল্প কর। আমি রেডি হয়ে বেরোচ্ছি। এমারিল খেয়ে ফেলেছি। গোসল সেরে গ্যালভাস খাবো। ততোক্ষণে নাশতা রেডি হয়ে যাবে।
মোমেন সাহেব বেডরুমে ঢুকলেন।
গোসল সেরে রেডি হতে মিনিট বিশেক লাগলো। বেরিয়ে ডাইনিংস্পেসে এলেন। এসে দেখেন টেবিলে সংযুক্তও বসেছে। পরনে বিসকিট রংয়ের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর সাদা টিশার্ট। মাথার চুল এলোমেলো। চোখে ঘুমভাব।
ছেলেকে দেখে খুশি হলেন মোমেন সাহেব। আরে, আমার বেটাও দেখি উঠে গেছে!
কেয়া বললেন, উঠেছে কী আর সাধে!
তার মানে বোনরা গিয়ে টেনে তুলেছে!
শৈলি বলল, বোনরা না। একবোন।
শ্রেয়া বলল, আপু তুলেছে।
চেয়ারে বসতে বসতে মোমেন সাহেব বললেন, শৈলির ভয়ে উঠল, না আদরে?
শৈলি বলল, বাবা, এটা তোমাদের ভুল ধারণা। তোমার পুত্র আমাকে একদমই ভয় পায় না।
শ্রেয়া বলল, আমাকে পায়। আমি মাঝে মাঝে মাইর দেই।
এবার কথা বলল সংযুক্ত। হ্যাঁ বাবা। শ্রেয়াপু আমাকে মারে।
বলিস কী? আমার ছেলের গায়ে হাত! এতবড় সাহস!
কথা না শুনলে মারবো না? পড়ালেখা তো করেই না বাবা। সারাক্ষণ গেমস নিয়ে আছে।
শৈলি বলল, হ্যাঁ বাবা। এটা ঠিক।
কিন্তু মারে কি কাজ হচ্ছে?
সংযুক্ত হাসল। ও রকম মার না বাবা। পরশুদিন একটা থাপ্পড় দিয়েছে।
শৈলি বলল, নাবিলকে বলো। নাবিল ওকে ঠিক করে ফেলবে। নাবিলের সবকথা শোনে।
সংযুক্ত বলল, ভাইয়াও তো খেলে! আমি থাকি ভিডিও গেমস নিয়ে, ভাইয়া থাকে পোলো নিয়ে। চান্স পেলেই পোলো খেলতে চলে যায়।
শৈলি হাসল। এটা ঠিক বাবা। নাবিল পোলোটা খুব ভাল খেলে। আমেরিকায় বেশ কয়েকবার প্রাইজ পেয়েছে। ঢাকায় আসার পর উত্তরায় যায় খেলতে।
কেয়া বললেন, ছেলেরা একটু এরকমই হয়। কথাবার্তা শোনে কম।
তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। তোমরা সবাই মিলে আমার ছেলেটার সঙ্গে রাগারাগি করো না। আমার ছেলে অনেক ভাল। খেলুক, একটু ভিডিও গেমস খেললে কী হয়!
শ্রেয়া বলল, এই আল­াদেই তোমার ছেলের কিছু হবে না। রেজাল্ট

খারাপ হলে কোথাও চান্স পাবে না।
তুমি এত বড় বড় কথা বলো না। এখন না হয় রেজাল্ট ভাল করছো। ক্লাস এইটে একবার ফেল করেছিলে না!
সেটা করেছি। কিন্তু তারপর? এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ, এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ। কমার্স থেকে কজনের এমন রেজাল্ট হয়?
মোমেন সাহেব বললেন, তুই হচ্ছিস আমাদের চোদ্দ গোষ্ঠির মধ্যে সবচাইতে ভাল ছাত্রী।
নূরজাহান বুয়া গরম গরম পরোটা ভেজে পাঠাচ্ছে। হালুয়া আগেই রেডি। তিন ছেলেমেয়ে খেতে শুরু করেছে। ঘিয়ের গন্ধে ভরে গেছে ফ্ল্যাট।
মোমেন সাহেবের সামনে পাতলা তিনটা আটার রুটি, একবাটি সবজি, দুটো সেদ্দ ডিম, একটা বাটিতে কয়েক টুকরো পাকা পেপে, পিরিচে একটুকরো লেবু। সবজিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে শুরু করলেন তিনি।
সংযুক্ত তাকাল বাবার দিকে। তুমি আজ একটা পরোটা খেলে পারতে বাবা। রোজ রোজ এই জিনিস খাও কী করে?
অভ্যাস হয়ে গেছে। খেতে ভালই লাগে। খুব তাড়াতাড়ি আমি মরতে চাচ্ছি না, বুঝলি। তোকে বিয়েশাদি করিয়ে, তারপর মরবো। ডায়াবেটিস ম্যানটেইন করতে পারলে মানুষ দীর্ঘজীবী হয়। ডায়াবেটিস হলে জাপানীরা খুব খুশি হয়, জানিস? মনে করে, ভালই হয়েছে। এখন নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা যাবে। আমি জাপানীদের মতো নিয়ম মেনে চলছি। তিনবারের খাবার ছবারে খাই। সকালে পঁয়তালি­শ মিনিট, সন্ধ্যায় পঁয়তালি­শ মিনিট হাঁটি। টুকটাক ফ্রিহ্যান্ড এক্সসারসাইজ করি। এজন্য এখনও ইনসুলিন ধরতে হয়নি। আশা করি এইভাবে আরও বছর দশেক চালিয়ে যাবো।
কেয়া ভারি খাবার পছন্দ করেন না। তবে আজ একটা পরোটা নিয়েছেন। কিন্তু হালুয়া নেননি। একসময় তার প্রিয় নাশতা ছিল ঘন দুধচায়ে পরোটা ভিজিয়ে খাওয়া। আজ তাই করছেন। এক মগ দুধচা নিয়ে পরোটা ভিজিয়ে খাচ্ছেন।
মোমেন সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকালেন। খুব ভাল লাগছে তোমাকে চা পরোটা খেতে দেখে।
এতে ভাল লাগার কী হল?
মনে হচ্ছে পুরনো দিনে ফিরে গেছি।
শৈলি বলল, কিন্তু তুমি তো যেতে চাইছো নতুন দিনে।
মানে?
শ্রেয়াকে বিয়ে দিয়ে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেবে পড়তে। সে গিয়ে সংযুক্তর ব্যবস্থা করবে। সংযুক্তও চলে যাবে। তাতোদিনে বিক্রমপুরের বাড়িটা করে ফেলবে। তারপর ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকবে।
হ্যাঁ তাই করবো। শহরের এই ঘিঞ্জি জীবন আর ভাল লাগে না। দশ বিঘা জমির ওপর বাড়ি হবে। বাড়িতে কোনও দেয়াল থাকবে না। গাছই হচ্ছে দেয়াল। গত কয়েক বছর ধরেই প্রতি বর্ষাকালে গাছ লাগাচ্ছি। এখনই বড় হয়ে গেছে গাছ। ফুল ফলের গাছ, ওষুধি গাছ আর সবুজ ঘাসে ভরা থাকবে বাড়ি। বাঁশঝাড় থাকবে কয়েকটা। বাঁশঝাড়ও লাগিয়ে ফেলেছি। আমাদের থাকার ঘরটা হবে পুরনো দিনের ডিসিদের বাংলোর মতো। ইট রংয়ের টালি দেয়া ছাদ। চারদিকে চওড়া বারান্দা। গাছে গাছে পাখি ডাকবে, হাওয়ায় ভাসবে ফুলের গন্ধ। নির্জন দুপুরে শুধু ঘুঘুপাখির ডাক শোনা যাবে। পুবদিকে একটা পুকুর থাকবে। মাছে ভরা থাকবে সেই পুকুর। বাড়ির পেছনদিকে দুতিন বিঘা জমিতে ধান চাষ হবে। সেই ধান ঢেকিতে ছেটে চাল করা হবে। ঢেকিঘর থাকবে বাড়িতে। ঢেকি ছাটা চালের ভাত খাবো। গরু থাকবে তিন চারটা। অর্থাৎ গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। ফল শাক সবজি সব নিজস্ব। তোদের মাকে নিয়ে আমি সেই বাড়িতে থাকবো।
শ্রেয়া বলল, এই হচ্ছে বাংলাসাহিত্য! তুমি কি কবিতা লিখতে নাকি বাবা?
না। মকবুল লিখতো। ওই যখন আমরা কলেজে জয়েন করেছি, তখন। ভালই লিখতো। পরে আর লিখলো না।
মুখের খাবার গিলে সংযুক্ত বলল, এটা খুব ইন্টাররেস্টিং বাবা। দুই বন্ধুর জন্ম তারিখ এক, চাকরি এবং বিয়ের তারিখ এক।
নেচারও অনেকটা এক রকম। মকবুলের শুধু একটাই দোষ, খুব সিগ্রেট খায়। চেইন স্মোকার। আর আমি কখনও সিগ্রেট ধরিইনি।
তোমাদের বন্ধুত্ব হল কবে?
মোমেন সাহেব কথা বলবার আগেই কেয়া বললেন, ফুলপুর কলেজে জয়েন করতে গিয়ে।
শৈলি বলল, আর বিয়ের তারিখ একই দিনে পড়েছিল বলে কেউ কারও বিয়েতে যেতে পারেনি।
শ্রেয়া বলল, এটা বলার মতো কথা হল! দুইবন্ধু তো আর একজনকে বিয়ে করছে না যে দেখা হবে!
শ্রেয়ার কথা বলার এই ভঙ্গিটা সবাই পছন্দ করে। এখনও করল। হাসতে লাগল সবাই।
মোমেন সাহেব বললেন, তবে সেই প্রথম জীবনে ওরকম মফস্বলের একটা কলেজে গেছি চাকরি করতে, মকবুলকে না পেলে ওখানে আমি টিকতেই পারতাম না। একই রুমে থাকতাম আমরা। একই সাবজেক্ট পড়াই। বাংলা। ধীরে ধীরে এমন গভীর হল বন্ধুত্ব, কী বলবো! কিন্তু জীবনের টান একটা অদ্ভুত ব্যাপার। দুজন দুজায়গায় ট্রান্সফার হলাম। ধীরে ধীরে কমতে লাগল যোগাযোগ। প্রথম প্রথম চিঠি লিখতাম দুজন দুজনকে। পরে কখনও কখনও ফোনে কথা হতো। মকবুল ঢাকায় এলে দেখাও হতো। গত কয়েক বছরে যোগাযোগ বেড়েছে মোবাইলের কারণে। মোবাইল ফোন অনেক কাছে এনে দিয়েছে আমাদের। মাঝে মাঝে কথা হয়। তবে দেখা হয় না। মকবুলের সঙ্গে আমার লাস্ট দেখা হল বছর চারেক আগে। বিয়ের পর ঈশিতা চলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়। মেয়েকে তুলে দিতে এসছে। সঙ্গে নীলাও আছে। বললাম, আমার ফ্ল্যাটে আয়। সময় করতে পারল না। উত্তরায় ওর এক আত্মীয়ের ফ্ল্যাটে উঠেছিল। মতিঝিলে কী কাজ ছিল, ওই কাজ সেরে এল আমার অফিসে। ঘণ্টাখানেক থাকলো। অনেক কথা বলল আর সিগ্রেট খেল। সবই পুরনো দিনের কথা। স্মৃতিচারণ। দুজন খেলাম একসঙ্গে। বলল, একদিন এসে আমার বাড়িটা দেখে যা। ভালই লাগবে। যাওয়া হয়নি। এবার আর না গিয়ে পারছি না। এমন করে বলল…
কেয়া বললেন, তাহলে রওনা দাও। যত তাড়াতাড়ি যাবে ততো তাড়াতাড়ি ফিরবে।
শৈলি বলল, বাবার সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছো?
খাবার দিয়েছি। মানে ফলটল দিয়েছে বক্সে করে।
ওষুধ?
দুপুরে কোনও ওষুধ লাগে না। রাতে এসে খাবে।
শ্রেয়া বলল, তার পরও দিয়ে দাও। বাইচান্স বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেল। রাতের ওষুধ তাহলে পাবে কোথায়?
মোমেন সাহেব বললেন, না থাকবো না।
বাইচান্স বলেছি বাবা।
শৈলি বলল, শ্রেয়া ঠিকই বলেছে আম্মু। বাবার ওষুধের বক্সটাও দিয়ে দাও।
ঠিক আছে। দিচ্ছি।

দুই

সিডস্টোর বাজারের কাছাকাছি এসে মকবুল সাহেবকে ফোন করলেন মোমেন সাহেব। কোনদিক দিয়ে ঢুকবো রে?
মকবুল সাহেব অবাক। তুই কি রাস্তা ভুলে গেছিস?
হ্যাঁ বন্ধু। চিনতে পারছি না।
তুই তো এখানে আসছিস। একবার এক জায়গায় এলে সেটা লোকে ভোলে কী করে?
আসছি চৌদ্দ পনেরো বছর আগে। জায়গা দেখাতে নিয়া আসছিলি। কয়েক বিঘা উঁচু জমি, বাকিটা ধানক্ষেত। একটা ডোবাও ছিল।
হ্যাঁ তাই। সেই এলাকা এখন নেই রে। অনেক বদলেছে। চেনার কথা না।
আর ডায়াবেটিস রোগীরা খুবই সূ²ভাবে, ধীরে ধীরে সবকিছুই ভুলতে থাকে। অতি পরিচিত মানুষের নাম, জায়গার নাম হঠাৎ করে দেখা গেল মনে করতে পারছে না।
শোন, বলে দিচ্ছি কীভাবে আসবি। প্রথমে সিডস্টোর বাজারে আয়। ঢাকা ময়মনসিংহ রাস্তার পাশেই। ঢাকা থেকে আসছিস, হাতের বাঁদিকে পড়বে। বাজারের মাঝখানে দিয়ে একটা রাস্তা পশ্চিম দিকে ঢুকে গেছে। ঢোকার মুখে হাতের ডানদিকে একটা বটগাছ। ওই রাস্তায় ঢোক। ঢুকে আসতে থাক। এক জায়গায় এসে দেখবি তোর বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে।
ওকে বন্ধু।
মোমেন সাহেবের ড্রাইভারের নাম কাদের। তিনি তাকে রাস্তা চিনিয়ে দিলেন।
বাজার এলাকা ছাড়াবার পর পরিষ্কার সুন্দর রাস্তা। দুপাশে গাছপালা ঘেরা ঘরবাড়ি। একটু এগোলে অবারিত ধানের মাঠ। সরু একটা খাল চলে গেছে উত্তর দক্ষিণে। খালের ওপর পুরনো কালভার্ট। এখন পৌনে বারোটা বাজে। নভেম্বরের শেষ দিক। একটু একটু শীত পড়ছে। তাও ঢাকায় শীত টের পাওয়া যায় না। গ্রাম এলাকায় সকাল সন্ধ্যার দিকে বোঝা যায় শীত আসছে।
মোমেন সাহেব চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন। ধানীমাঠ সোনালি রোদে ঝলমল করছে। খালের পানিটা কালো, নোংরা। তার মানে মিল কারখানার কেমিক্যাল এসে পড়ছে। এই দিকটায় নানা রকমের মিল কারখানা হয়েছে। ডাইনিং ফ্যাক্টরি, টেক্সটাইল মিল। বহু বড় বড় কোম্পানি শত শত বিঘা জমি কিনে নিয়েছে। দশ হাজার টাকায় কেনা জমির দাম হয়েছে বিশ পঁচিশ লাখ টাকা। জমির কারণেই মকবুলের ভাগ্য বদলেছে। এই এলাকায় ওঁর শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুর পক্ষই জমি কেনার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিল। মকবুলের নিজের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ওপারে, নবীগঞ্জ নামের এক জায়গায়। সেটাও দামি জায়গা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই মকবুলের। পৈতৃক সূত্রে যেটুকু ছিল ভাইবোনরা ভাগ করে নিয়েছে। ছোট বোনটা বিধবা হয়েছে অল্প বয়সে। নিজের অংশটুকু সেই বোনকে লিখে দিয়েছেন মকবুল।
মকবুলের জীবনের এসব ঘটনা জানেন মোমেন সাহেব। সবই মকবুল তাঁকে বলেছেন।
আরে, ওই তো মকবুল দাঁড়িয়ে আছে!
রাস্তার ডানপাশে দুতিনটা কদমগাছ, একটা বকুলগাছ। বকুলগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে আছেন মকবুল সাহেব। পরনে বিসকিট রংয়ের প্যান্টের ওপর সাদা পাঞ্জাবি। তার ওপর গেরুয়া রংয়ের চাদর। হাতে যথারীতি সিগ্রেট। এই জিনিসটা মকবুল ছাড়তে পারেননি। ফুক ফুক করে টানছেন।
মোমেন সাহেব উচ্ছ¡সিত গলায় বললেন, ওই আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে। কাদের, গাড়ি থামাও।
গাড়ি থামলো। মোমেন সাহেব নামলেন। সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে এগিয়ে এসে দুহাতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন মকবুল সাহেব। কতদিন পর তোকে দেখলাম! কতদিন পর তোকে এভাবে জড়িয়ে ধরলাম!
মোমেন সাহেবও দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন বন্ধুকে। আমারও একই অনুভূতি।
তাই হওয়ার কথা। তোর আর আমার অনেক কিছুই একরকম। আবেগ অনুভূতি ভালবাসা। চল, বাড়ি চল।
গাড়ি?
বাড়িতে ঢুকে যাবে।
বাড়ি কোনটা?
আয় আমার সঙ্গে। গাড়ি আসতে বল পেছন পেছন।
কদম বকুল গাছগুলোর মাঝখান দিয়ে সতেরো আঠারো ফুট চওড়া মাটির রাস্তা চলে গেছে উত্তর দিকে। রাস্তার দুধারে ধানের জমি। খানিক এগিয়ে একটা বাড়িই দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। অনেকগুলো মাটির ঘর। একতলা একটা দালানও আছে। ইলেকট্রিক পুল দাঁড়িয়ে আছে পুবদিককার কোনায়। কয়েকটা নারকেলগাছ, বেশ পুরনো একটা বকুলগাছ। ঘরগুলোর মাঝখান দিয়ে রাস্তা। পাঁচ ভাইয়ের এক বাড়ি। যে যার ভাগে নিজের মতো করে ঘর তুলে নিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে মকবুল সাহেবকে খেয়াল করছিলেন মোমেন সাহেব।
তোর শরীর এত ভেঙেছে কেন রে?
মকবুল সাহেব বন্ধুর দিকে মুখ ফেরালেন। কোথায় ভেঙেছে? ঠিকই তো আছি!
আরে না, একদমই ঠিক নেই। তুই কেমন ছোট হয়ে গেছিস।
মানে?
আগের আকৃতি নেই। একটু যেন কুঁজো হয়ে হাঁটছিস। ঈশিতা চলে যাওয়ার সময় তোকে দেখলাম। বেশ তরতাজা লাগছিল।
বয়স হয়েছে না! বয়স বাড়লে এমনই হয়।
তোর মুখটা আগের মতো নেই। গায়ের রং আগের মতো নেই। না, এমন হওয়ার কথা না। তোর তো ডায়াবেটিস নেই?
না। প্রেসার আছে, গ্যাস্ট্রিক আছে।
ওসব আমারও আছে।
মকবুল সাহেব তীক্ষèচোখে বন্ধুর দিকে তাকালেন। তুই ভালই আছিস। একদমই আগের মতো। শরীর স্বাস্থ্য ঠিক আছে, গায়ের রং পোশাক আশাক সব মিলিয়ে খুবই ভাল লাগছে তোকে। ডায়াবেটিস আছে, তেষট্টি বছর বয়স হয়েছে, কিছুই বোঝা যায় না।
আমি খুবই মেনটেইন করি, বন্ধু।
দুই বাড়ির মাঝখান পেরিয়ে হাতের বায়ে বেশ বড় একটা পুকুর। দেখে বোঝা যায় মাছ চাষ হচ্ছে। পানিতে মাছের খলবল খলবল শব্দ। পুব পাশে ধানের মাঠ। রাস্তার দুধারে মেহগনি গাছ ছায়া ফেলে রেখেছে।
তারপরই গাছপালায় নিবিড় হয়ে থাকা একটা বাড়ি। রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে সেই বাড়িতে। দেয়াল বেড়া কিচ্ছু নেই। শুধুই গাছপালা। পুবদিকে একটা পুকুর। পুকুরের তিনপারে নানারকম গাছ সার ধরে আছে। পুকুরের উত্তরে ফলের বাগান। ঢোকার মুখে, পুব দিকটায় শুধুই কাঁঠাল গাছ। কাঁঠালের বাগানই বলা যায়। এই এলাকার মাটি লাল। কাঠাল জন্মায় প্রচুর। গাছতলার সবুজ ঘাস গালিচার মতো বিছিয়ে আছে। দুপুর হয়ে আসা রোদ হাওয়ায় অদ্ভুত নির্জন পরিবেশ। দূরের বাঁশঝাড়ে শনশন শব্দ। ঘুঘুপাখি ডাকছে কোনও গাছের ডালে বসে।
মোমেন সাহেবের মনে হল তিনি অন্য একটা জগতে চলে এসেছেন।
আগের দিনকার ডিসিদের বাংলোর মতো বাংলোবাড়ি। চারদিকে চওড়া বারান্দা, একটু নিচু ধরনের টালির ছাদ। সামনে সবুজ এক টুকরো জমি। বাংলোর লাগোয়া হাসনুহেনা বেলি কামিনীর ঝোপ। কাঁঠালচাপা জবা টগর গন্ধরাজ। গাঁদাফুলের সিজন শুরু হয়েছে। একপাশ হলুদ হয়ে আছে গাঁদা ফুলে।
মোমেন সাহেব বিস্মিত। ঠিক এরকম একটা বাড়ির স্বপ্নই দেখছেন তিনি। বিক্রমপুরের জমিতে যেমন বাড়ি তিনি করতে চান ঠিক যেন সেই বাড়িটাই করে বসে আছেন তাঁর বন্ধু। এ কী করে সম্ভব!
বারান্দায় উঠতে উঠতে কথাটা তিনি বললেন। মকবুল সাহেব হাসলেন। এমনই হওয়ার কথা। আমাদের সবকিছুই একরকম। শুধু একটা ব্যাপারে তুই আমার চে’ এগিয়ে আছিস। তোর তিন ছেলেমেয়ে, আমার মাত্র একটা মেয়ে।
মকবুল সাহেব স্ত্রীকে ডাকলেন। নীলা, মোমেন এসে গেছে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন নীলা। স্লামালেকুম ভাই।
ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছো, নীলা?
আছি ভাই। এই বয়সে যেমন থাকা যায়।
না, তুমি ভালই আছো। তেমন চেঞ্জ হওনি। কিন্তু আমার বন্ধু ভাল নেই মনে হচ্ছে।
কী করে থাকবে বলুন? কথা শোনে না। সিগ্রেটটা ছাড়তেই পারলো না। রাতে ঘুমায় কম। কিছুদিন ধরে দেখছি বিছানায় নেই। রাত দুপুরে বারান্দায় বসে সিগ্রেট টানে আর কী যেন ভাবে। জ্যোৎস্না রাতে বাগানের দিকে হেঁটে বেড়ায়।
তোমাদের এদিকে ভূত আছে?
নীলা অবাক। জি?
না মানে বুড়ো বয়সে আমার বন্ধুটাকে ভূতে ধরল নাকি?
নীলা হাসলেন। ভূতে না, বোধহয় পেতনিতে ধরেছে।
মকবুল সাহেব বললেন, একটা পেতনি বহু বছর ধরেই ধরে আছে। সেটাকে সরিয়ে নতুন করে আর কে ধরবে!
তার মানে আমি পেতনি!
মোমেন সাহেব বললেন, পেতনি বলিস না গাধা। বল পরি। নীলপরি।
নীলা বলল, বারান্দায় বসে রইলেন কেন? ভিতরে আসুন।
এখানে বসতেই ভাল লাগছে। ভিতরে পরে যাই।
মকবুল সাহেব বললেন, খাবার দাবার এখানেই দাও।
এখন চা ছাড়া আর কিছু খাবো না রে। কেয়া খুবই কেয়ারিং। গাড়িতে খাবার দিয়ে দিয়েছিল। একটা টিফিন বক্সে পেপে নাশপাতি পেয়ারার বিচির অংশটা ফেলে…। মানে ডায়াবেটিকদের যে রকম খাওয়া উচিত। যদিও সুগার কমে যাওয়ার একটা টেনডেন্সি আমার আছে। পকেটে চকলেট রাখি।
নীলা বললেন, আমিও ফল কেটে রেখেছি। আমাদের এখানে ফ্রেশ ফলটা আপনি পাবেন। সবই আমাদের বাগানের।
মকবুল সাহেব বললেন, ফল চাল মাছ শাকসবজি সব আমার এখানে হয়। বাইরে থেকে কিনি না।
তার পরও তোর শরীরের এই দশা কেন?
মকবুল সাহেব উদাস ভঙ্গিতে সিগ্রেট ধরালেন।
নীলা বললেন, তাহলে চা দেব?
আমি খাই গ্রিনটি। গাড়িতে আছে। কাদেরকে বলছি, দিয়ে যাবে।
আপনার বন্ধুও গ্রিনটিই খায়।
গুড। তাহলে তো কথাই নেই। দাও।
গ্রিনটির ব্রান্ড দেখে অবাক মোমেন সাহেব। ইংল্যান্ডের টুইনিংস। পিওর গ্রিনটি। ঠিক এই চা-টাই খান তিনি। উচ্ছ¡সিত গলায় বললেন, আরে, এই চা-টাই তো খাই আমি। ঠিক এরকম মগে। মগভর্তি করে।
মকবুল সাহেব হাসিমুখে বললেন, তাই হওয়ার কথা। বললাম না, আমাদের অনেক কিছুই এক রকম। নিজেদের অজান্তে মিলে যায়।
নীলা বললেন, এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। যে শোনে সেই খুব অবাক হয়। দুবন্ধুর অনেক কিছুই এক রকম। এমন সাধারণত হয় না।
বারান্দায় তিনটা হালকা ধরনের চেয়ার, নিচু একটা টেবিল। চায়ের মগ টেবিলে রেখেছেন নীলা।
দুবন্ধু প্রায় একসঙ্গে মগ হাতে নিলেন। নীলা তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। মোমেন সাহেব বললেন, বসো নীলা।
নীলা বসলেন।
তোমাদের এতসব দেখা শোনা করে কে?
লোক আছে ভাই। একটা পরিবার আছে সেই শুরু থেকে। এই এলাকারই লোক। ভূমিহীন। লোকটার নাম আজমত। বউর নাম মরিয়ম। একটা ছেলে আছে তেরো চৌদ্দ বছরের। নাম মন্টু। সোনার বাংলা হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। আজমত আর মরিয়মই সামলায় সব। খুবই কাজের লোক। রান্নাঘরের ওদিকে ওদের ঘর।
মকবুল সাহেব বললেন, মন্টু ছেলেটাও কাজের। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে মা বাবার সঙ্গে কাজ করে। এই এলাকার লোকজন একটু অলস টাইপের। কিন্তু আজমতের পরিবারটা তার উলটো। ভাল কাজ করে। শরীরে অলসতা বলে কিছু নেই। ওরা না থাকলে এত শান্তিতে এখানে আমি থাকতে পারতাম না।
নীলা বললেন, কেয়া আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এলে পারতেন ভাই।
চায়ে চুমুক দিয়ে মোমেন বললেন, তা পারতাম। আজ সকালে বড়মেয়েও এসেছে। সবাইকে নিয়ে এলে পারতাম।
অনেকদিন ওদের সঙ্গে দেখা হয় না।
তোমরাও তো ঢাকায় এলে পারো। দেখাসাক্ষাৎ যোগাযোগটা খুব জরুরি। মকবুল আমার এত প্রিয়বন্ধু, কিন্তু দেখা হল চার বছর পর। ভাবা যায়? এতদিন হল বাড়ি করেছো তোমরা, আসাই হয়নি আমার।
মকবুল সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে উদাস গলায় বললেন, একটা পর্যায়ে এসে জীবন এরকমই হয়। জীবনের চক্রটাই এমন। এক ব্যস্ততার পর আরেক ব্যস্ততা। কিছু না কিছু নিয়ে মেতে থাকা। এই যে ধর রিটায়ার লাইফ আমাদের, তার পরও কি ফুরসত আছে? কোনও না কোনও কাজ তো করছি। কিছু না কিছু নিয়ে তো মেতে আছি। আমি আছি এই বাড়িঘর ধান গরু গাছপালা মাছ নিয়ে। বিদেশে থাকা মেয়ের সংসার জীবনের খোঁজ খবর নিয়ে। ভাইবোন আত্মীয় স্বজনের নানারকম সমস্যা। অমুকের বিয়ে, তমুকের অসুখ। কোনও না কোনও সমস্যা, উৎকণ্ঠা আছেই। কোনও না কোনও কাজ, কোনও না কোনও ছুটোছুটি আছেই। জীবন আসলে একটা যাত্রা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া দীর্ঘ একটা পথ। আমরা হাঁটছি। পথে কত রকমের জটিলতা, কত স্বপ্ন, কত আশা। মাইকেল বলেছেন না, ‘আশার ছলনে ভুলি’। আমরা সবাই আশার ছলনেই সব ভুলে থাকি।
মোমেন সাহেব হাসলেন। বিরাট দার্শনিক তত্ত¡ দিচ্ছ বন্ধু!
নীলা বললেন, আপনার বন্ধু আজকাল এই ধরনের কথাবার্তাই বলে।
এরকম পরিবেশে থেকে দার্শনিক হয়ে গেছে।
নীলা হাসিমুখে উঠলেন। আমি একটু যাই।
মকবুল বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ যাও। দেখো ওই দিকে মরিয়ম কী করছে? রান্নাবান্নার কতদূর কী হল?
নীলা চলে যাওয়ার পর মকবুল বললেন, খুব শিগ্রই ওদের সবাইকে নিয়ে একবার আয়। জামাই নাতনিও নিয়ে আসিস। একটা দিন সবাই মিলে হৈ চৈ করে কাটাই। ঈশিতারও আসার কথা জানুয়ারির দিকে। তখন এলে…
কথা শেষ না করে থেমে গেলেন মকবুল সাহেব। উদাস চোখে গাছপালার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরালেন।
আজমত লোকটাকে দেখা গেল এসময়। ভেতর বাড়ি থেকে হেঁটে গাড়ির কাছে এল। কাদের দাঁড়িয়ে আছে গাড়িতে হেলান দিয়ে। তাকে ডেকে নিয়ে গেল ভেতর বাড়িতে। নিশ্চয় কাদেরের নাশতার ব্যবস্থা করেছে নীলা।
মোমেন সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, সত্যি রে মকবুল, তোর বাড়ি দেখে আমি অবাক। ঠিক এরকম একটা বাড়ির প্ল্যানই আমি করেছি। একদম এরকম। বাড়িতে দেয়াল বেড়া কিচ্ছু থাকবে না। গাছই হচ্ছে দেয়াল। সেভাবে গাছ অবশ্য আমি লাগিয়ে ফেলেছি। এরকম একটা বাংলো থাকবে। সবুজ ঘাস, নানা রকমের ফুল ফলের গাছ, বাঁশঝাড়, পুকুর। রান্নাঘরের পাশে ঢেঁকিঘর গোয়ালঘরটা থাকবে বাড়ির পেছন দিকে। গরু থাকবে তিন চারটা। গোয়ালঘরের পরই ধানের জমি।
মকবুল সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন, সিগ্রেটে বড় করে টান দিলেন। এই ব্যাপারটাই হচ্ছে ‘আশার ছলনে ভুলি’। স্বপ্ন আর আশা মৃত্যু ছাড়া কখনই শেষ হয় না।
একটু থেমে বললেন, তুই যেভাবে বাড়ির কথা বললি আমার কিন্তু তেমনই। বাড়ির পেছন দিকেই গোয়ালঘর, তারপর ধানের জমি। রান্নাঘরের পাশে ঢেঁকিঘর বাড়িতে ঢোকার মুখ থেকে আমার জমি। রাস্তাটা আমি নিজ খরচে বানিয়েছি। যেখানে তোর জন্য দাঁড়িয়েছিলাম ওখান থেকে চারশো একুশ ফুট। রাস্তার দুধারে যত গাছপালা দেখছিস সব আমার।
আমার বিক্রমপুরের বাড়ির রাস্তা নিয়ে একটু সমস্যা আছে, বুঝলি। কোনদিক দিয়ে রাস্তা বের করবো ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি যেদিক দিয়ে ভাবছি ওইদিক দিয়ে করলে এরকম চারশো বিশ তিরিশ ফুট মাটি ফেলে রাস্তা তৈরি করতে হবে।
মকবুল সাহেব চট করে বন্ধুর দিকে মুখ ফেরালেন। রাস্তার সমস্যা এখানেও ছিল। এই জমিতে ঢোকার কোনও রাস্তাই ছিল না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তোর মনে নেই? তোকে যখন জায়গা দেখাতে আনলাম…
মকবুল সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই মোমেন সাহেব বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে। এদিক দিয়ে আমরা আসিইনি। ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে সরু আলপথ দিয়ে এসেছিলাম। কয়েক বিঘা উঁচ জমি, কয়েকটা তালগাছ আর চারদিকে ডোবা নালা, ধানক্ষেত। প্যাচপ্যাচে কাদা।
হ্যাঁ। যেখানে আমরা বসে আছি, অর্থাৎ এই বাড়িটাই হচ্ছে সেই উঁচু জমি। তালগাছগুলো কেটে ফেলেছি। তালগাছ থাকলে অন্যগাছ ভাল হয় না। তালগাছের শেকড় অনেকদূর ছড়ায়। এই জমিটুকু ছিল আমার শ্বশুরের। আমার শ্বশুর বাড়ি এখান থেকে তিন চার কিলোমিটার পশ্চিমে। যে দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে রাস্তা ওটা হচ্ছে মোল­াবাড়ি। বাড়ির মালিক ছিলেন আমার শ্বশুরের বন্ধু। ভদ্রলোকের নাম কাশেম মোল­া। কী কাজে সাতশো টাকার দরকার হয়েছে। জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবেন। লোক পান না। কে কিনবে এখানকার জমি? স্বাধীনতার ঠিক পরের বছর। বাহাত্তোর সালের কথা। আমার শ্বশুরকে বললেন, তোমার টাকা পয়সা আছে। কিনে রাখো জায়গাটা। কোনওদিন কাজে লাগবে। রাস্তাঘাট নেই। তাও জমিটা কিনলেন শ্বশুর। সাত বিঘার দাম সাতশো টাকা। কিনলেন বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য। ভাবতে পারিস, সাতশো টাকায় সাত বিঘা। তার মানে প্রতি বিঘা একশো টাকা।
ছেলেমেয়েরা শুনলে বিশ্বাস করবে না। আমাদেরই তো বিশ্বাস হয় না।
হ্যাঁ। এই জমি নীলাকে দিয়েছিলেন আমার শ্বশুর। কাশেম মোল­া মারা যাওয়ার পর ছেলেরা যে যার জমি ভাগ করে নিল। প্রচুর জমি ছিল ওদের। এক দেড়শো বিঘা হবে। ছেলেরা কেউ কিছু করে না। জমি বিক্রি করে আর খায়। বাজারে গিয়ে আড্ডা দেয়। আমার শ্বশুর তখনও বেঁচে আছেন। আমাকে বললেন, জমি কেনো। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। পানির দাম। আমিও যেটুকু পয়সা হাতে আসে ওই দিয়ে টুকটাক করে কিনি। সবই মোল­াদের জমি। একসঙ্গে টাকাও দিতে হয়নি। যখন যেটুকু পেরেছি দিয়েছি। এইভাবেই হয়েছে সব।
এসব আমি জানি রে মকবুল।
তা জানিস। কিন্তু জমি তো কিনছিই, রাস্তার কথা মাথায়ই আসছে না। যখন বাড়ি করতে এলাম তখন হঠাৎ খেয়াল হল, রাস্তা কোথা দিয়ে করবো? বাড়িতে ঢুকবো কোন দিক দিয়ে?
ঠিক এই সমস্যা আমারও হয়েছে।
শোন তারপর কী করলাম। মোল­াদের সঙ্গে কথা বললাম। তোমাদের বাড়ির মাঝখান দিয়ে রাস্তা বানাতে চাই। সরকারি রাস্তার সঙ্গে গিয়ে মিলবে। তাতে তোমাদের বাড়িরও ভ্যালু বাড়বে। ওরা রাজি কিন্তু নিজেরা একটা পয়সাও দেবে না। শুধু মাটিটা দিতে রাজি হল পাঁচ ভাইয়ের সেজোটা। ওই যে পশ্চিম দিকে পুকুরটা দেখলি, মাছ খলবল করছে, বলল, এই জমি কেটে মাটি নিন। পুকুর করে দিন আমাকে। রাস্তা সবার, পুকুর আমার। সেইভাবে সব করলাম। ওর পুকুর হল, আমার হল রাস্তা। রাস্তার কারণে জমির দাম আরও বাড়ল। আর ওই পুকুরে মাছচাষ করে, মাছের আয়ে সংসার চলছে ছেলেটার।
ভালই হয়েছে। বাড়িতে গাড়ি ঢুকছে, এরকম রাস্তা হওয়ার ফলে তোর বাড়ির ভ্যালুও বেড়েছে।
তা ঠিক। তবে মোল­ারা লোক ভাল। নীলাকে নিজেদের বোন মনে করে। বয়সে ছোটগুলো আমাকে ডাকে দুলাভাই। বড় দুজন ডাকে জামাই। খুবই মান্য করে। আমাকে না বলে কিছুই করে না। এই এলাকায় জমির দাম বাড়ল ইন্ডস্ট্রিয়াল এরিয়া ঘোষণার পর। গ্যাস আসার পর। ওই যে খালটা দেখলি, পানি দেখেছিস, একদম কালো! সব ডাইনিং ফ্যাক্টরির কারণে। খালের পারে পারে ডাইনিং ফ্যাক্টরি। ঢাকার বহু বড় ব্যবসায়ি এদিকে জমি কিনেছে। ধানের মাঠ, বিল যা দেখছিস, সব বিক্রি হয়ে গেছে। এখন কেনার মতো জমিই পাওয়া যায় না।
এতক্ষণে মোমেন সাহেবের মনে পড়ল আসল কথা। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, ওই দেখ, আসল কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। তুই যেন কী গোপন কথা বলবি? এই বয়সে কী এমন গোপনকথা, বন্ধু? কোনও বিধবা নারীর প্রেমে পড়েছো নাকি?
মকবুল সাহেব ম্লান হাসলেন। আরে না বেটা। ওসব হলে তো ভালই হতো।
তাহলে হয়েছে কী?
বলবো, বলবো। অস্থির হওয়ার কিছু নেই।
মকবুল উঠে দাঁড়ালেন। চল, তোকে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাই।
চল।
আগে ঘরদুয়ার দেখা। কোন ঘরে থাকি, কোথায় খাই, বসি।
ওঁরা ভেতরে ঢুকলেন। মকবুল সাহেব সব দেখাতে লাগলেন। এই হচ্ছে বসার ঘর, ড্রয়িংরুম আর কী! ওই দিকের রুমটা ঈশিতার। এই রুমটা আমাদের। ডাইনিং রুমের ডানপাশের রুমটা গেস্টরুম। মোট পাঁচটা বেডরুম। চারটাই খালি পড়ে থাকে। রাতেরবেলা মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি। আমি রাত জেগে একা একা ঘুরে বেড়াই।
ডাইনিংরুমে এলেন দুবন্ধু। তাঁদের সাড়া পেয়ে পেছন দিককার রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন নীলা। টেবিলে নানান পদের ফল কেটে ঢেকে রেখেছেন। মোমেন সাহেবকে বললেন, বসেন ভাই, বসেন। চা খাওয়া হয়েছে, এখন ফল খান।
মকবুল সাহেব বললেন, হ্যাঁ। ফল খা মোমেন। তারপর চল বেরোই।
পেপে শবরীকলা পেয়ারা সুন্দর করে কেটে সাজানো। কাটা চামচ রাখা আছে প্লেটের পাশে। তিনটি ফলই মোমেন সাহেবের পছন্দ। তিনি খেতে শুরু করলেন।
মকবুল, তুইও খা।
মকবুল সাহেব বসেছেন ঠিকই, খাচ্ছেন না। উদাস হয়ে আছেন।
শুরু থেকেই মোমেন সাহেব খেয়াল করছেন, কথার ফাঁকে ফাঁকেই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছেন মকবুুল। চেহারায় হঠাৎ হঠাৎ ছায়া ফেলছে বিষণœতা। উদাস হচ্ছেন থেকে থেকে। মকবুল কখনও এমন ছিলেন না! কী হয়েছে তাঁর?
কথাটা বললেন মোমেন সাহেব। কী হয়েছে রে তোর?
মকবুল সাহেব চমকালেন। কই, কিছু হয়নি তো?
নিশ্চয় কিছু হয়েছে। কথায় কথায় অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিস, উদাস হয়ে যাচ্ছিস।
নীলা বললেন, বেশ কিছুদিন ধরেই এমন দেখছি ভাই। সারাক্ষণ কেমন মনমরা আর বিষণœ হয়ে থাকে। আমি বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, কী হয়েছে? বলে কিছুই হয়নি। ঈশিতাকেও জানিয়েছি। বলেছি, তোর বাবা আজকাল হাসেই না। মেয়েও ফোন করে নানা রকমভাবে জানতে চেয়েছে। ওই এককথা, কিচ্ছু হয়নি।
এক টুকরো পেয়ারা মুখে দিলেন মোমেন সাহেব। বিষণœতা জিনিসটা ভাল না। এটা একটা রোগ। ধীরে ধীরে বাড়ে। আমার পরিচিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন, ঢাকায় আয়, তাঁকে দেখাই।
নীলা বললেন, হ্যাঁ ভাই, দেখান।
মকবুল সাহেব বললেন, তার মানে আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি? পাগলের ডাক্তার দেখাতে চাচ্ছিস?
মনোরোগের ডাক্তার মানেই কি পাগলের ডাক্তার?
তো কী? আগের দিনে এই ধরনের ডাক্তারদেরকেই পাগলের ডাক্তার বলতো। এখন দিন বদলেছে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দও বদলে গেছে। পাগলের ডাক্তাররা হয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সাইকিয়াট্রিস্ট।
কাটা চামচে গেঁথে এক টুকরো পেপে মুখে দিলেন মকবুল সাহেব। সেই ফাঁকে নিজেকে বদলাবার প্রস্তুতি নিলেন। খুবই স্বাভাবিক গলায় বললেন, হয়নি কিছুই। ঘুমটা কমে গেছে। রাতেরবেলা উঠে বারান্দায় বসে থাকি আর নয়তো হাঁটাহাঁটি করি। খুব মৃত্যুচিন্তা হয়, বুঝলি?
চলি­শ পার হওয়ার পর থেকেই মৃত্যুচিন্তা শুরু হয়। ওটা পাত্তা দেয়ার কিছু নেই। আমার মনে হয় ঘটনা সেটা না। তোর ঘটনা অন্য। তুই লুকাবার চেষ্টা করছিস।
নীলা বললেন, আমারও তাই মনে হয়।
মকবুল সাহেব বললেন, চান্স পেয়ে বেশ আমার বন্ধুর সঙ্গে গলা মিলাচ্ছো, না?
গলা মিলাচ্ছি না, যা সত্য তাই বলছি।
মোমেন সাহেব পেয়ারার পর পেপে ধরেছেন। এক টুকরো মুখে দিয়ে বললেন, অসাধারণ পেপে রে! এরকম গাছপাকা, ফ্রেশ পেপে বহুদিন পর খেলাম।
তোর বাড়িটা হয়ে গেলে খেতে পারবি।
কিন্তু তোর গোপন কথাটা তো এখনও বললি না?
মকবুল সাহেব নীলার দিকে তাকালেন। যাহ্, বউর সামনে বলে ফেললি! তাহলে আর গোপন থাকলো কোথায়?
ততোক্ষণে নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন মকবুল সাহেব। হাসিমুখে বললেন, গোপনকথা কিছুই নেই। তোকে এখানে আনার জন্য চালাকি করেছি। ওভাবে না বললে তুই আসতি না। কোনও না কোনও বাহানা ধরতি।
নীলা বললেন, ও তাহলে এই চালাকি করে মোমেন ভাইকে আনিয়েছো?
হ্যাঁ। নইলে আসতো নাকি! কত রকমের ব্যস্ততা দেখাতো!
নীলা হাসিমুখে বললেন, খুবই ভাল করেছো। আমি যাই, দেখি রান্না শেষ হল কি না।
নীলা বরাবরই খুব সরল ধরনের মানুষ। চালাকি, ছলচাতুরি বোঝেন কম। খুব সহজে সব বিশ্বাস করেন। কিন্তু মোমেন সাহেব বুঝলেন, বউর সামনে গোপন ব্যাপারটা খুব ভাল ম্যানেজ করলেন মকবুল। নিশ্চয় গোপন কোনও ব্যাপার ওঁর আছে।
মকবুল এখন একেবারেই স্বাভাবিক। বন্ধুর হাতে একটা শবরীকলা ধরিয়ে দিয়ে উঠলেন, উঠ। কলা খেতে খেতে বাড়িঘর দেখ।
দুবন্ধু বেরোলেন।
বাংলোর পেছন দিকটায় ছেলেবেলার মতো এক টুকরো উঠোন। এত সুন্দর করে নিকানো, এত পরিষ্কার। পশ্চিম পাশে টিনের রান্নাঘর। সঙ্গে ঢেঁকিঘর। পুবপাশে বড়সড় একটা দোচালা টিনের ঘর। দূরে, উত্তর দিকটায় গোয়ালঘর। গোয়ালঘরের সামনেটাও পরিষ্কার। তিনটা কদমগাছ পাশাপাশি। গোয়ালঘরের পেছনে জোড়া জামগাছ। জামের পাতায় খেলা করছে দুপুরবেলার রোদ।
উঠোনে নেমে মোমেন সাহেবের মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। বাহ্, কী সুন্দর পরিবেশ। ছেলেবেলায় দেখা স্বচ্ছল গেরস্তবাড়ির মতো।
মরিয়ম রান্না করছে। নীলা দাঁড়িয়ে আছেন রান্নাঘরের সামনে। মন্টু ছেলেটা গোসল করে ফিরেছে। উঠোনের তারে ভেজা প্যান্ট শুকাতে দিচ্ছে।
মকবুল সাহেব বললেন, মোমেন, এই ছেলেটা মন্টু।
তা বুঝেছি।
মন্টু সালাম দিল। বেশ সুন্দর উচ্চারণে। আসসালামোয়ালাইকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। পড়াশোনা কেমন চলছে, মন্টু?
জি ভাল।
পুবের ঘরটা দেখিয়ে মকবুল সাহেব বললেন, এই ঘরটা আজমতের।
তা বুঝেছি।
আর ওটা হচ্ছে রান্নাঘর। সঙ্গেরটা ঢেঁকিঘর।
মোমেন সাহেব ছেলেমানুষের ভঙ্গিতে বললেন, তুই আমাকে রান্নাঘর আর ঢেঁকিঘর চেনাচ্ছিস?
মকবুল সাহেব এই প্রথম প্রাণখুলে হাসলেন। বাঙালকে হাইকোর্ট চেনাচ্ছি।
স্বামীকে হাসতে দেখে নীলা এগিয়ে এলেন। খুব ভাল লাগছে তোমাকে এভাবে হাসতে দেখে। কতদিন পর এভাবে হাসছো তুমি। মোমেন ভাই, আপনি আসাতে লোকটা বদলে গেছে। বলে যাবেন, এরকমই যেন থাকে। মরার চিন্তা সবারই হয়। ওই ভেবে মরার আগেই মরে যেতে হবে নাকি! মরতে একদিন সবারই হবে। ওসব নিয়ে এত ভাববার কী আছে!
মকবুল সাহেব বললেন, ঠিক আছে। বন্ধুর সামনে প্রমিজ করছি, আর মনমরা হয়ে থাকবো না। যতদিন বেঁচে আছি, আমাকে ঠিক এরকমই পাবে। চল মোমেন, গোয়ালের দিকটা দেখি। গরুগুলো দেখ। ধানক্ষেতগুলো দেখ। তারপর ঢুকবো বাগানে। ফলের গাছগুলো দেখাবো, পুকুর দেখবো। তবে একটা জিনিস এখনই দেখাবো না।
কোনটা?
বাঁশঝাড়।
ও আর দেখানোর কী আছে? এখান থেকেই তো দেখতে পাচ্ছি।
না রে, ওখানে একটা দেখাবার জিনিস আছে। পরে দেখাবো।
খুবই প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে বন্ধুর কাঁধে হাত দিলেন মকবুল সাহেব।

তিন

বাঁশঝাড়তলায় এসে মুগ্ধ হয়ে গেলেন মোমেন সাহেব। ছবির মতো সুন্দর এক টুকরো জায়গা। তিনটা বাঁশঝাড় পাশাপাশি। বাঁশঝাড়ের পুব দিকটায় বাড়ির উঠোনের মতো একটুখানি জায়গা। সেখানে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটা বেঞ্চ। দুজন মানুষ বসতে পারে এমন ব্যবস্থা। জায়গাটা ছাড়িয়ে বাড়ির সীমানায় নানারকম ঝোঁপঝাড়। বুনোফুল ফুটে আছে। তারপর শুরু হয়েছে ধানের মাঠ। পুবদিকে বহুদূর পর্যন্ত। দুপুর শেষ হয়ে আসা রোদে ঝিমছিম করছে মাঠ। বাঁশের পাতায় পাতায় খেলছে মৃদু হাওয়া। দুয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে।
মোমেন সাহেব মুগ্ধ গলায় বললেন, অসাধারণ।
বন্ধুকে মুগ্ধ হতে দেখে মকবুলও উচ্ছ¡সিত। সুন্দর না?
সত্যি সুন্দর। ছবির মতো।
এখানটায় মাঝে মাঝে এসে বসে থাকি, বুঝলি! দুপুর শেষ হয়ে আসা এই সময়টায়। বিকেলবেলা বা সন্ধ্যা হয় হয় এরকম সময়ে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় এখানটায় বসলে। পৃথিবী কী সুন্দর! আর এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে! মনটা খুব খারাপ হয়।
মোমেন সাহেব বেঞ্চে বসলেন। বন্ধুর কথা যেন শুনতেই পাননি। অপলক চোখে তাকিয়ে আছেন সামনের ধানীমাঠের দিকে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে গ্রিনটি নিয়ে বারান্দায় বসেছিলেন দুবন্ধু। মকবুলের হাতে সিগ্রেটও ছিল। মরিয়মের রান্না খুবই পছন্দ হয়েছে মোমেন সাহেবের। চার রকম মাছ, সবজি শাক ঘনডাল আর ঢেকিছাটা চালের লালচে ভাত। সাধারণত যেটুকু ভাত মোমেন সাহেব খান, আজ খেয়েছেন তারচে’ অনেক বেশি। নীলা সামনে দাঁড়িয়ে তুলে দিচ্ছিলেন। মোমেন সাহেব বরাবরই তাঁকে বোঝাচ্ছিলেন, এত দিও না। আমি এত খাই না। সুগার বেড়ে যাবে।
নীলার এককথা। একদিন একটু বাড়লে কিছু হবে না, ভাই। খান।
সবশেষে অদ্ভুত একটা জিনিস খাওয়ালো। দুধভাত আর খেজুড়ে গুড়।
মকবুল সাহেব বললেন, নিজের গাছের রস দিয়ে গুড় করা হয়েছে। গুড়ের মধ্যে নারকেল দেওয়া আছে। দুধভাত তো আজকাল আর খাওয়া হয় না। নীলাকে বলেছিলাম ব্যবস্থা করতে। খা খা। ভাল লাগবে।
তারপর চা খেয়ে বাঁশঝাড়তলায় এসেছেন দুবন্ধু।
মকবুল সাহেবের হাতে সিগ্রেট। টান দিয়ে বললেন, জানতাম এই জায়গাটা দেখে তুই খুবই মুগ্ধ হবি। এজন্যই তখন এখানে আনিনি। আমি এক সময় কবিতা লিখতাম, জীবনানন্দে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এরকম একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে।
ঠিকই রে। স্বপ্নটা তোর পূরণ হয়েছে।
তোরও হবে। আমাদের স্বপ্নগুলোও তো এক রকম। আমার হয়েছে, তোরও হবে।
তারপরই উদাস হয়ে গেলেন মকবুল সাহেব। মাঝখানে যেটুকু সময় উচ্ছল ছিলেন সেই উচ্ছলতা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। সিগ্রেট টানতে টানতে উদাস চোখে ধানী প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মোমেন সাহেব বন্ধুকে খেয়াল করলেন। নীলার সামনে তুই যে একটা চালাকি করলি, সেটা কিন্তু আমি বুঝেছি।
তা আমি জানি। তুই আমার মতো। তোর বোঝার কথা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মকবুল সাহেব। নীলাটা এত সরল। ছলচাতুরি চালাকি, একটু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলা কথা বুঝতেই পারে না। সামান্য জিনিসে কী অসামান্য খুশি হয়। সাইনোসাইটিসের প্রবলেম আছে। তিনবার কলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনিয়েছি। ওখানকার ওষুধে ভাল থাকে সে। খুব ভাল ঘুমায়। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম। রাতে ঘুম ভাঙে খুব কম। আমি ওর পাশে থেকে উঠে যাই, টেরই পায় না।
টের না পেলে জানলো কী করে, তুই রাতে তেমন ঘুমাস না! উঠে বারান্দায় বসে সিগ্রেট খাস! বাগান পুকুরের দিকে হাঁটতে চলে যাস!
বাগান পুকুরের দিকে যাই জ্যোৎস্নারাতে। ভরা চাঁদের রাতে কী যে অপূর্ব লাগে গাছপালা। গাছের পাতায় পাতায় যেন গলে পড়ে চাঁদের আলো। মৃদু হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপে পাতা। ওই যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন না, ‘আলোর নাচন পাতায় পাতায়’। আমি জ্যোৎস্নার নাচন দেখি পাতায় পাতায়। পুকুরের জলে চাঁদের আলো এমন করে পড়ে, যেন মায়াবি এক টর্চ লাইটের আলো পড়েছে। পুকুর জলেও খেলে যায় হাওয়া। সূক্ষè একটা ঢেউ, একটু যেন ঝিলিমিলি খেলা। মাছগুলো দিনের আলো ভেবে ভুল করে। জলের তলা থেকে উঠে খলবল খলবল শুরু করে। একই ভুল করে পাখিরা। হঠাৎ ডাকতে শুরু করে। এগাছ থেকে ওগাছে উড়াল দেয়। ঝিঁঝিঁপোকা আর কীটপতঙ্গরা ডাকতেই থাকে। শেয়াল ছুটে যায় মাঠের দিকে। অদ্ভুত অচেনা এক জগৎ হয়ে যায় আমার প্রতিদিনকার চেনা, প্রতি মুহূর্তের চেনা এই পরিবেশ। একাকী হাঁটতে হাঁটতে আমার তখন শুধু মনে হয়, এই অসাধারণ সুন্দর জায়গাটায় আমি থাকবো না। আমাকে চির বিদায় নিতে হবে।
মোমেন সাহেব তীক্ষèচোখে বন্ধুর মুখের দিকে তাকালেন। মকবুল সাহেব খেয়াল করলেন না। সিগ্রেটে টান দিয়ে বললেন, হাসনুহেনা ফোটার রাতে, কামিনী ফোটার রাতে, কাঠালচাঁপা ফোটার রাতে ফুলের গন্ধে সেই ‘কাজলা দিদি’ কবিতার মতো আমার ঘুম আসে না। ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’। তখন আবার মনে হয়, আমি থাকবো না। সবই থাকবে, শুধু আমি থাকবো না। সকালবেলা যখন সূর্যের আলো এসে পড়ে তখনও একই অনুভূতি হয়। এখন তো একটু কুয়াশা পড়ে। সকালবেলা ঘাসের ডগায় দুয়েক ফোটা শিশির। সকালবেলার রোদে ঘাসের ডগা যেন হেসে ওঠে। গাছের পাতারা যেন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। কী যে সুন্দর পরিবেশ। ফুলের গন্ধ নিয়ে হাওয়া বয়ে যায়। সকাল যে কখন দুপুর হয়ে যায়, টের পাই না। পাখি ডাকে অবিরাম। কত রকম মধুর ডাক। মৃত্যুর পর এই ডাক আমি কোথায় পাবো! পাখিদের বাসাবাঁধা খুবই খেয়াল করে দেখি, বুঝলি! ঘুঘুপাখি শালিকপাখি আরও কত অচেনা পাখি বাসাবাঁধার জন্য খড়কুটো মুখে নিয়ে উড়ে যায়। বাসাবাঁধে, ডিমপাড়ে। ছানা ফুটিয়ে কী পরিশ্রম করে তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য। তারপর ছানারা বড় হয়ে অচেনা আকাশে উড়াল দেয়। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখি। আমার তখন মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ে, জানিস। মনে হয় মানুষের জীবনও আসলে পাখিদেরই জীবন। লালন পালন করে বড় করে ছানা, সেই ছানা একদিন নিজের আকাশে ডানা মেলে। নিজের মতো করে তৈরি করে তার জগৎ। নিজস্ব জগৎ। তারপর একদিন এমন অচেনা এক আকাশে উড়াল দেয়, সেই আকাশ থেকে আর ফেরা হয় না। সেই উড়ালের নাম মৃত্যু।
মোমেন সাহেব আগের মতোই তাকিয়ে আচেন বন্ধুর মুখের দিকে। মকবুল সাহেবের কথা শেষ হতেই বললেন, তোর কী হয়েছে?
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে টোকা দিয়ে ফেললেন মকবুল সাহেব। উদাস হলেন। তুই বুঝিসনি যে আসলেই তোর সঙ্গে আমার একটা গোপন কথা আছে?
বুঝেছি। সেকথা বলার জন্যই বাঁশঝাড়তলায় তখন আমাকে আনিসনি।
হ্যাঁ। ঠিক তাই। নীলাকে বুঝতে দেইনি কিছুই।
মোমেন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, কথাটা বল।
আমার ক্যান্সার।
মোমেন সাহেবের বুকে তীব্র একটা ধাক্কা লাগল। সেই কোন ছেলেবেলায় একবার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলেন গ্রামের মাঠে। বয়সে বড় একটা ছেলে এমন একটা শট করলো বলে, বলটা এসে লাগল বুকের ঠিক মাঝখানে। দম বন্ধ হয়ে মাঠে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। এখনকার অবস্থাটা ঠিক তেমন। তিনি কথা বলতে পারেন না। তাঁর দম যেন বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মকবুল সাহেব বললেন, ফুসফুসের ক্যান্সার। অতিরিক্ত সিগ্রেট খাওয়ার ফল। কেউ জানে না। জানি শুধু আমি। প্রথমে ঢাকায় টেস্ট করিয়েছি। তারপর গেছি ব্যাংককে। বামরুনগ্রাদে টেস্ট করাবার পর নিশ্চিত হয়েছি। সব করিয়েছি একা একা। কাউকে কিছু বুঝতে দেইনি। ঢাকায় একা যাওয়া তো কোনও ব্যাপার না। কিন্তু ব্যাংকক যাওয়ার সময় নীলা সঙ্গে যেতে চেয়েছে। ঈশিতা তাঁকে বলেছে সঙ্গে যেতে। আমি যে শরীরের ব্যাপারে যাচ্ছি এসব বুঝতে দেইনি। বলেছি বন্ধুরা দল বেঁধে বেড়াতে যাচ্ছি। সহজেই ম্যানেজ করতে পেরেছি সব। কাউকে কিছুই জানতে বুঝতে দেইনি। বামরুদগ্রাদের ডাক্তাররা বললেন, কালই ভর্তি হও। কেমোথেরাপি শুরু করতে হবে। এটেনডেন্ট নিয়ে এসো। পরদিন আমি দেশে চলে এসেছি। হাসিমুখে নীলাকে এসে বলেছি, দারুণ মজা করে এলাম। ঈশিতাকে ফোন করে উচ্ছ¡সিত গলায় বলেছি, ভাল বেড়ালাম মা। ভেতরে আমার ক্যান্সার, আমার দুজন আপন মানুষের কেউ টেরই পেল না। ঢাকায় গেলাম, ব্যাংককে গেলাম, তোকে টেরই পেতে দিলাম না। বুকের ভেতর ক্যান্সার চেপে আমি দিন কাটাচ্ছি। আমি জানি, নীলা ঈশিতা টের পেলেই তুলকালাম শুরু করবে। টাকা আমার আছে। দেদারসে খরচা করবে। বামরুনগ্রাদেই চিকিৎসা করাবে। আমার এই শরীর আর শরীর থাকবে না। কেমো খুবই কষ্টের। তার পরও বাঁচার নিশ্চয়তা নেই। শরীরটাকে এই কষ্ট আমি দেবো না। একদিন ঘুম ভেঙে সবাই দেখবে, আমি আর উঠছি না। এজন্য আমি উদাস হই, বিষণœ আর অন্যমনস্ক হই। আমার ঘুম আসে না। একলা জেগে রই।
একটু থামলেন মকবুল সাহেব। তারপর বললেন, কদিন আগে হঠাৎ মনে হল তোর কথা। তোর সবকিছু আমার মতো। একথা মনে হওয়ার পর দিশেহারা হয়ে গেলাম। সর্বনাশ! আমার রোগ যদি তোরও হয়! তোর মুখটা দেখার জন্য পাগল হয়ে গেলাম। কথাটা তোকে বলার জন্য পাগল হয়ে গেলাম।
বন্ধুর কাঁধে হাত রাখলেন মকবুল সাহেব। আমাদের অনেক কিছু একরকম। অজান্তে মিলে যায় অনেক কিছু। পরম করুণাময়ের কাছে আমার প্রার্থনা, আমাদের এই জিনিসটা যেন না মেলে। তিনি যেন আমার রোগটা তোকে না দেন। আমি চলে যাওয়ার পরও যেন অনেক অনেক বছর বেঁচে থাকিস তুই। আমার চোখ দিয়ে যেন এই সুন্দর পৃথিবীটা দেখিস। সকাল দুপুর বিকেল রাত্রি, চাঁদ সূর্যের খেলা, হাওয়া আর ফুলের সুবাস, মাছ আর পাখির জীবন, আকাশ আর তারার মেলা, তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া চারদিক, তুই মন ভরে সব দেখিস। আমার মতো করে দেখিস। কিন্তু আমার রোগের কথাটা কাউকে বলিস না। আমি চলে যাওয়ার পরও না। তাহলে নীলা খুব দুঃখ পাবে, আমার মেয়েটা খুব দুঃখ পাবে।
অনেকক্ষণ ধরে বুকটা উথাল পাথাল করছিল মোমেন সাহেবের। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দুহাতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
মকবুল সাহেবেরও চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে। তেষট্টি বছর বয়সী দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে জড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদছেন, কাঁদছেন।
ধানী মাঠের প্রান্তে বেলা তখন পড়ে আসছিল।

তিন

বাঁশঝাড়তলায় এসে মুগ্ধ হয়ে গেলেন মোমেন সাহেব। ছবির মতো সুন্দর এক টুকরো জায়গা। তিনটা বাঁশঝাড় পাশাপাশি। বাঁশঝাড়ের পুব দিকটায় বাড়ির উঠোনের মতো একটুখানি জায়গা। সেখানে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটা বেঞ্চ। দুজন মানুষ বসতে পারে এমন ব্যবস্থা। জায়গাটা ছাড়িয়ে বাড়ির সীমানায় নানারকম ঝোঁপঝাড়। বুনোফুল ফুটে আছে। তারপর শুরু হয়েছে ধানের মাঠ। পুবদিকে বহুদূর পর্যন্ত। দুপুর শেষ হয়ে আসা রোদে ঝিমছিম করছে মাঠ। বাঁশের পাতায় পাতায় খেলছে মৃদু হাওয়া। দুয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে।
মোমেন সাহেব মুগ্ধ গলায় বললেন, অসাধারণ।
বন্ধুকে মুগ্ধ হতে দেখে মকবুলও উচ্ছ¡সিত। সুন্দর না?
সত্যি সুন্দর। ছবির মতো।
এখানটায় মাঝে মাঝে এসে বসে থাকি, বুঝলি! দুপুর শেষ হয়ে আসা এই সময়টায়। বিকেলবেলা বা সন্ধ্যা হয় হয় এরকম সময়ে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় এখানটায় বসলে। পৃথিবী কী সুন্দর! আর এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে! মনটা খুব খারাপ হয়।
মোমেন সাহেব বেঞ্চে বসলেন। বন্ধুর কথা যেন শুনতেই পাননি। অপলক চোখে তাকিয়ে আছেন সামনের ধানীমাঠের দিকে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে গ্রিনটি নিয়ে বারান্দায় বসেছিলেন দুবন্ধু। মকবুলের হাতে সিগ্রেটও ছিল। মরিয়মের রান্না খুবই পছন্দ হয়েছে মোমেন সাহেবের। চার রকম মাছ, সবজি শাক ঘনডাল আর ঢেকিছাটা চালের লালচে ভাত। সাধারণত যেটুকু ভাত মোমেন সাহেব খান, আজ খেয়েছেন তারচে’ অনেক বেশি। নীলা সামনে দাঁড়িয়ে তুলে দিচ্ছিলেন। মোমেন সাহেব বরাবরই তাঁকে বোঝাচ্ছিলেন, এত দিও না। আমি এত খাই না। সুগার বেড়ে যাবে।
নীলার এককথা। একদিন একটু বাড়লে কিছু হবে না, ভাই। খান।
সবশেষে অদ্ভুত একটা জিনিস খাওয়ালো। দুধভাত আর খেজুড়ে গুড়।
মকবুল সাহেব বললেন, নিজের গাছের রস দিয়ে গুড় করা হয়েছে। গুড়ের মধ্যে নারকেল দেওয়া আছে। দুধভাত তো আজকাল আর খাওয়া হয় না। নীলাকে বলেছিলাম ব্যবস্থা করতে। খা খা। ভাল লাগবে।
তারপর চা খেয়ে বাঁশঝাড়তলায় এসেছেন দুবন্ধু।
মকবুল সাহেবের হাতে সিগ্রেট। টান দিয়ে বললেন, জানতাম এই জায়গাটা দেখে তুই খুবই মুগ্ধ হবি। এজন্যই তখন এখানে আনিনি। আমি এক সময় কবিতা লিখতাম, জীবনানন্দে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এরকম একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে।
ঠিকই রে। স্বপ্নটা তোর পূরণ হয়েছে।
তোরও হবে। আমাদের স্বপ্নগুলোও তো এক রকম। আমার হয়েছে, তোরও হবে।
তারপরই উদাস হয়ে গেলেন মকবুল সাহেব। মাঝখানে যেটুকু সময় উচ্ছল ছিলেন সেই উচ্ছলতা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। সিগ্রেট টানতে টানতে উদাস চোখে ধানী প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মোমেন সাহেব বন্ধুকে খেয়াল করলেন। নীলার সামনে তুই যে একটা চালাকি করলি, সেটা কিন্তু আমি বুঝেছি।
তা আমি জানি। তুই আমার মতো। তোর বোঝার কথা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মকবুল সাহেব। নীলাটা এত সরল। ছলচাতুরি চালাকি, একটু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলা কথা বুঝতেই পারে না। সামান্য জিনিসে কী অসামান্য খুশি হয়। সাইনোসাইটিসের প্রবলেম আছে। তিনবার কলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনিয়েছি। ওখানকার ওষুধে ভাল থাকে সে। খুব ভাল ঘুমায়। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম। রাতে ঘুম ভাঙে খুব কম। আমি ওর পাশে থেকে উঠে যাই, টেরই পায় না।
টের না পেলে জানলো কী করে, তুই রাতে তেমন ঘুমাস না! উঠে বারান্দায় বসে সিগ্রেট খাস! বাগান পুকুরের দিকে হাঁটতে চলে যাস!
বাগান পুকুরের দিকে যাই জ্যোৎস্নারাতে। ভরা চাঁদের রাতে কী যে অপূর্ব লাগে গাছপালা। গাছের পাতায় পাতায় যেন গলে পড়ে চাঁদের আলো। মৃদু হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপে পাতা। ওই যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন না, ‘আলোর নাচন পাতায় পাতায়’। আমি জ্যোৎস্নার নাচন দেখি পাতায় পাতায়। পুকুরের জলে চাঁদের আলো এমন করে পড়ে, যেন মায়াবি এক টর্চ লাইটের আলো পড়েছে। পুকুর জলেও খেলে যায় হাওয়া। সূক্ষè একটা ঢেউ, একটু যেন ঝিলিমিলি খেলা। মাছগুলো দিনের আলো ভেবে ভুল করে। জলের তলা থেকে উঠে খলবল খলবল শুরু করে। একই ভুল করে পাখিরা। হঠাৎ ডাকতে শুরু করে। এগাছ থেকে ওগাছে উড়াল দেয়। ঝিঁঝিঁপোকা আর কীটপতঙ্গরা ডাকতেই থাকে। শেয়াল ছুটে যায় মাঠের দিকে। অদ্ভুত অচেনা এক জগৎ হয়ে যায় আমার প্রতিদিনকার চেনা, প্রতি মুহূর্তের চেনা এই পরিবেশ। একাকী হাঁটতে হাঁটতে আমার তখন শুধু মনে হয়, এই অসাধারণ সুন্দর জায়গাটায় আমি থাকবো না। আমাকে চির বিদায় নিতে হবে।
মোমেন সাহেব তীক্ষèচোখে বন্ধুর মুখের দিকে তাকালেন। মকবুল সাহেব খেয়াল করলেন না। সিগ্রেটে টান দিয়ে বললেন, হাসনুহেনা ফোটার রাতে, কামিনী ফোটার রাতে, কাঠালচাঁপা ফোটার রাতে ফুলের গন্ধে সেই ‘কাজলা দিদি’ কবিতার মতো আমার ঘুম আসে না। ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’। তখন আবার মনে হয়, আমি থাকবো না। সবই থাকবে, শুধু আমি থাকবো না। সকালবেলা যখন সূর্যের আলো এসে পড়ে তখনও একই অনুভূতি হয়। এখন তো একটু কুয়াশা পড়ে। সকালবেলা ঘাসের ডগায় দুয়েক ফোটা শিশির। সকালবেলার রোদে ঘাসের ডগা যেন হেসে ওঠে। গাছের পাতারা যেন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। কী যে সুন্দর পরিবেশ। ফুলের গন্ধ নিয়ে হাওয়া বয়ে যায়। সকাল যে কখন দুপুর হয়ে যায়, টের পাই না। পাখি ডাকে অবিরাম। কত রকম মধুর ডাক। মৃত্যুর পর এই ডাক আমি কোথায় পাবো! পাখিদের বাসাবাঁধা খুবই খেয়াল করে দেখি, বুঝলি! ঘুঘুপাখি শালিকপাখি আরও কত অচেনা পাখি বাসাবাঁধার জন্য খড়কুটো মুখে নিয়ে উড়ে যায়। বাসাবাঁধে, ডিমপাড়ে। ছানা ফুটিয়ে কী পরিশ্রম করে তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য। তারপর ছানারা বড় হয়ে অচেনা আকাশে উড়াল দেয়। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখি। আমার তখন মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ে, জানিস। মনে হয় মানুষের জীবনও আসলে পাখিদেরই জীবন। লালন পালন করে বড় করে ছানা, সেই ছানা একদিন নিজের আকাশে ডানা মেলে। নিজের মতো করে তৈরি করে তার জগৎ। নিজস্ব জগৎ। তারপর একদিন এমন অচেনা এক আকাশে উড়াল দেয়, সেই আকাশ থেকে আর ফেরা হয় না। সেই উড়ালের নাম মৃত্যু।
মোমেন সাহেব আগের মতোই তাকিয়ে আচেন বন্ধুর মুখের দিকে। মকবুল সাহেবের কথা শেষ হতেই বললেন, তোর কী হয়েছে?
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে টোকা দিয়ে ফেললেন মকবুল সাহেব। উদাস হলেন। তুই বুঝিসনি যে আসলেই তোর সঙ্গে আমার একটা গোপন কথা আছে?
বুঝেছি। সেকথা বলার জন্যই বাঁশঝাড়তলায় তখন আমাকে আনিসনি।
হ্যাঁ। ঠিক তাই। নীলাকে বুঝতে দেইনি কিছুই।
মোমেন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, কথাটা বল।
আমার ক্যান্সার।
মোমেন সাহেবের বুকে তীব্র একটা ধাক্কা লাগল। সেই কোন ছেলেবেলায় একবার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলেন গ্রামের মাঠে। বয়সে বড় একটা ছেলে এমন একটা শট করলো বলে, বলটা এসে লাগল বুকের ঠিক মাঝখানে। দম বন্ধ হয়ে মাঠে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। এখনকার অবস্থাটা ঠিক তেমন। তিনি কথা বলতে পারেন না। তাঁর দম যেন বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মকবুল সাহেব বললেন, ফুসফুসের ক্যান্সার। অতিরিক্ত সিগ্রেট খাওয়ার ফল। কেউ জানে না। জানি শুধু আমি। প্রথমে ঢাকায় টেস্ট করিয়েছি। তারপর গেছি ব্যাংককে। বামরুনগ্রাদে টেস্ট করাবার পর নিশ্চিত হয়েছি। সব করিয়েছি একা একা। কাউকে কিছু বুঝতে দেইনি। ঢাকায় একা যাওয়া তো কোনও ব্যাপার না। কিন্তু ব্যাংকক যাওয়ার সময় নীলা সঙ্গে যেতে চেয়েছে। ঈশিতা তাঁকে বলেছে সঙ্গে যেতে। আমি যে শরীরের ব্যাপারে যাচ্ছি এসব বুঝতে দেইনি। বলেছি বন্ধুরা দল বেঁধে বেড়াতে যাচ্ছি। সহজেই ম্যানেজ করতে পেরেছি সব। কাউকে কিছুই জানতে বুঝতে দেইনি। বামরুদগ্রাদের ডাক্তাররা বললেন, কালই ভর্তি হও। কেমোথেরাপি শুরু করতে হবে। এটেনডেন্ট নিয়ে এসো। পরদিন আমি দেশে চলে এসেছি। হাসিমুখে নীলাকে এসে বলেছি, দারুণ মজা করে এলাম। ঈশিতাকে ফোন করে উচ্ছ¡সিত গলায় বলেছি, ভাল বেড়ালাম মা। ভেতরে আমার ক্যান্সার, আমার দুজন আপন মানুষের কেউ টেরই পেল না। ঢাকায় গেলাম, ব্যাংককে গেলাম, তোকে টেরই পেতে দিলাম না। বুকের ভেতর ক্যান্সার চেপে আমি দিন কাটাচ্ছি। আমি জানি, নীলা ঈশিতা টের পেলেই তুলকালাম শুরু করবে। টাকা আমার আছে। দেদারসে খরচা করবে। বামরুনগ্রাদেই চিকিৎসা করাবে। আমার এই শরীর আর শরীর থাকবে না। কেমো খুবই কষ্টের। তার পরও বাঁচার নিশ্চয়তা নেই। শরীরটাকে এই কষ্ট আমি দেবো না। একদিন ঘুম ভেঙে সবাই দেখবে, আমি আর উঠছি না। এজন্য আমি উদাস হই, বিষণœ আর অন্যমনস্ক হই। আমার ঘুম আসে না। একলা জেগে রই।
একটু থামলেন মকবুল সাহেব। তারপর বললেন, কদিন আগে হঠাৎ মনে হল তোর কথা। তোর সবকিছু আমার মতো। একথা মনে হওয়ার পর দিশেহারা হয়ে গেলাম। সর্বনাশ! আমার রোগ যদি তোরও হয়! তোর মুখটা দেখার জন্য পাগল হয়ে গেলাম। কথাটা তোকে বলার জন্য পাগল হয়ে গেলাম।
বন্ধুর কাঁধে হাত রাখলেন মকবুল সাহেব। আমাদের অনেক কিছু একরকম। অজান্তে মিলে যায় অনেক কিছু। পরম করুণাময়ের কাছে আমার প্রার্থনা, আমাদের এই জিনিসটা যেন না মেলে। তিনি যেন আমার রোগটা তোকে না দেন। আমি চলে যাওয়ার পরও যেন অনেক অনেক বছর বেঁচে থাকিস তুই। আমার চোখ দিয়ে যেন এই সুন্দর পৃথিবীটা দেখিস। সকাল দুপুর বিকেল রাত্রি, চাঁদ সূর্যের খেলা, হাওয়া আর ফুলের সুবাস, মাছ আর পাখির জীবন, আকাশ আর তারার মেলা, তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া চারদিক, তুই মন ভরে সব দেখিস। আমার মতো করে দেখিস। কিন্তু আমার রোগের কথাটা কাউকে বলিস না। আমি চলে যাওয়ার পরও না। তাহলে নীলা খুব দুঃখ পাবে, আমার মেয়েটা খুব দুঃখ পাবে।
অনেকক্ষণ ধরে বুকটা উথাল পাথাল করছিল মোমেন সাহেবের। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দুহাতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
মকবুল সাহেবেরও চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে। তেষট্টি বছর বয়সী দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে জড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদছেন, কাঁদছেন।
ধানী মাঠের প্রান্তে বেলা তখন পড়ে আসছিল।

লেখকঃ

ইমদাদুল হক মিলন