তৃষ্ণা ও জলের কবিতা

‘একদিন হও তুমি খেজুরের গাছ…’
খেজুর গাছ?
চিঠি পড়ে মনে মনে হাসি পেল তার। কী যে উপমা! সুদীপ দিন দিন ভালগার হচ্ছে। আজ ফোন করলে আচ্ছামতো বকা দিতে হবে। ইস, সখ কতো! থাকবে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে, আর যখন তখন যা খুশি তা করার ইচ্ছে হবে। বললেই হলো? এতোই যদি সখ তাইলে চলে এলেই পারে। দেখি কেমন তৃষ্ণা তার! বলেছে বাকল খসাবে বলে তরতর করে গাছ বেয়ে উঠে যাবে। খেজুরের রস ফ্রেস চেখে দেখা চাই। ‘হ্যাড আই দ্য উইংস অব এ ডাভ!’
আজকালতো পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। চাইলেই চলে আসতে পারো। এই সব চিঠিতে উতলা করে আমাকে আর কতো জ্বালাবে! তুমি চাও আমি তেজপাতা হয়ে যাই? তুমি ইচ্ছা মতো আসবে যাবে আর খেজুর রসের তৃষ্ণা হবে, বললেই হলো? যদি সম্ভব হতো তাইলে খেজুর গাছ ধর্মঘটে যেতো। কিন্তু তাতে নিজেরই ক্ষতি, অপ্রাপ্তি। তাইতো ধর্মঘটের কথা ভাবতে পারেনা।
সুদীপ লিখেছে আজকের চিঠিটিই তার পাঠানো উপহার। নুহাশ যেমন বাবার পাঠানো লবষ্টার খাওয়ার স্মৃতি মনে করে হুমায়ূনের মৃত্যু শয্যায় একটা হৃদয়স্পর্শী চিঠি লিখে বলেছিল, ‘ দিস ইজ মাই লবষ্টার ফর ইউ’ – ঠিক তেমন। সে জানে তার একটি চিঠিই মেয়েটির কাছে সবচেয়ে প্রিয় উপহার।
আজ মেয়েটির জন্মদিন। মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। পঁয়তালি­শ, পঁয়ত্রিশ কিংবা পঁচিশ। কিছুতেই কিছু যায় আসেনা। সে আজ নিজেকে ভাবে উনিশ। সুদীপ আজ বহুদিন তাকে আটকে রেখেছে উনিশে। বলে, বাড়তে দেবেনা। আহা, যেন টাইম মেশিন! ইস, যদি ফিরে যাওয়া যেতো! মেয়েটি তবুও ভাবে, ইচ্ছে হলেইতো ফিরে যাওয়া যায়। শরীর ভাঙ্গলে ভাঙ্গুক। মনতো আর ভাঙ্গছেনা। সুদীপের ছোঁয়া পেলে শরীরের ভাঙ্গনের গতি কিছুটা হলেও থমকে যায়। ইউ আর এজ ওল্ড এজ ইউ ফিল। সত্যিইতো। তার আজ উনিশে যেতে ইচ্ছে করছে। আহা, যদি ফ্যাক্স বা ইমেইলে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারতো চিঠির মতো! সুদীপের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। ঘুম থেকে উঠে মেইল খুলে কেউ যদি এমন চিঠি পায় তাইলে কার না মন উচাটন হয়, কে না চায় উনিশে ফিরে যেতে! ইউ আর রাইট। দিস ইজ ইউর লবষ্টার ফর মি। ইচ্ছে হয় লবষ্টার গিলে খায়। এতো সুন্দর করে কেউ লিখে!
কী নাম মেয়েটির? ধরে নেয়া যাক ‘টাপুর’। এই নামটা তার খুব পছন্দ। ছেলে বেলায় বৃষ্টির দিনে বাইরে বেরুনো বারন ছিল। ঘরের বারান্দায় নিশার সাথে এক্কা দোক্কা খেলা। আর টিনের চালে বৃষ্টির টাপর টুপুর শব্দ মুগ্ধ হয়ে শোনা। ইচ্ছে হতো কেউ তাকে টাপুর বলে ডাকবে।
এই নিশা! শোন, তুই আমাকে টাপুর বলে ডাকবি। আমি তোকে টুপুর।
আমি কি তোর মতো পাগল? ওটা তোর বরের জন্য রেখে দে। সে তোকে সোহাগ করে কত কিছুই ডাকবে। ‘টাপুর’ ‘ঢাপুর’ যা খুশি ডাকতে বলিস।
বরকে বলার সাহস হয়নি। পাছে যদি পাগল মনে করে। বিছানা ছাড়া অন্য কোথাও বা অন্য কোন সময়ে ‘সোনামনি’ বলেইতো ডাকেনি। আবার ‘টাপুর’!
আজ ঝকঝকে রোদেলা দিন। তবুও তার বৃষ্টির শব্দ শুনতে ইচ্ছে করছে। না, রাস্তায় কিংবা দালানের ছাদে নয়। টিনের চালে। আবু হাসান শাহরিয়ার কবিতায় যেমন লিখেছেন, ‘টিনের চালে বিটোফেনের চিঠি’। কী সুন্দর উপমা! টাপুরের মতো সব মেয়েরা নিশ্চয়ই বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে শাহরিয়ারের প্রেমে পড়ে যায়।
নিশার কথা মনে হতেই ভাবনা হয়। অন্য সময় হলে সাত সকালে ফোন বা এসএমএস করতো। বলতো পার্টি কখন হচ্ছে? কোন রেষ্টুরেন্টে?
কিসের পার্টি? বুড়িদের আবার বার্থডে কী?
বরের টাকা বাঁচাতে চাচ্ছিস? সেটি হচ্ছেনা। নো পার্টি, তো নো গিফট।
অথচ নিশার ফোন বা এসএমএস কিছুই আসেনি। সাত সকালেই হয়তো হাসপাতালে দৌড়েছে। সোহেল এখনো পুরোপুরি সেরে উঠেনি।
নিশার কথা ভাবতেই ছোটবেলার কত কথা মনে পড়ে গেল। ঠুনকো সব অজুহাতে কতোই না ঝগড়া আর মারামারি করেছে। কে মশারি টানাবে, কে ফ্যানের নিচে শোবে এই সব। আর সোহেল যদি এসে ওকে কোন কারণে একটু ডেকেছে তাইলে তো নিশার গাল ফোলানো থাকতো তিন দিন।
আমি কী করবো? তুই না করে দিতে পারিস না আমার সাথে কথা বলতে?
কেন, তুই চুপ করে থাকতে পারিস না? ছোট বোনের জামাইকে ভাগানোর ধান্দা! তোর বরকে যদি আমি না ভাগিয়ে নেই তাইলে আমার নাম নিশা না।
এইটুকু পুঁচকে মেয়ের কথা শুনলে গা জ্বলে যায়। পাশের বাড়ির ছেলেকে এখনি জামাই ডাকছে। এতটুকু লজ্জাও নেই।
সেই সোহেল আজ হাসপাতালে। যদিও সেরে উঠছে তবুও নিশার অনেক মন খারাপ। নিশার কথা ভেবে টাপুরেরও মন খারাপ হয়ে যায়। মেয়েটি নিজেকে আবারো টাপুর বলে ভাবতে থাকে। দু’ এক ফোঁটা জল ঝরে যায়। এই ঝরে যাওয়া কি ছেলেবেলার স্মৃতির জন্য, নিশার জন্য, সুদীপের জন্য নাকি নিজের জন্য টাপুর তা বুঝতে পারেনা।
আজ কী তাহলে পার্টি হবেনা? মেয়েটি নিশ্চিত না। নিজের পার্টি কি নিজে দেয়া যায়! এমনো হতে পারে, কাজল অফিস থেকে ফিরেই বলবে, ‘চলো যাই। ম্যান্ডারিন রেষ্টুরেন্ট বুক করে এসেছি। শায়লা, সায়ন্তী তোমরা কোথায়? আম্মুকে হ্যাপি বার্থডে বলেছো?’ দেখা গেল রাতে বালিশের নিচ থেকে বেরুচ্ছে সারপ্রাইজ গিফট। হীরের আংটি কিংবা দামি কোন শাড়ি। আচ্ছা, সারপ্রাইজ গিফট যদি আগে থেকে অনুমান করা যায় তাইলে তাকে কী বলা যায়? সেমি-সারপ্রাইজ গিফট? নাকি প্রেডিক্টেবল সারপ্রাইজ। টাপুর খুশি হবে কিনা জানেনা। সে আরো বেশি সারপ্রাইজ চায়। আনপ্রেডিকটেবিলিটি চায়। আজ তার জন্মদিন। সে কারো খেজুরের গাছ হতে চায়। কাজল গাছি হতে জানেনা। সে জানে ঘড়াটা উলটে খেতে। যেন রস নিজে নিজে ঘড়ায় জমা হবে। কিন্তু তাতে কী গাছের আশ মেটে? তার প্রয়োজন গাছি, যে বাকল খসিয়ে ঘড়া টানিয়ে দেবে। সুদীপ, তুমি কেন এতো দূরে থাকো? খেজুর গাছ যে ঘড়ায় ঝরাতে চায়! শুধু তোমার জন্য।
রাতে হয়তো সবাইকে নিয়ে ম্যান্ডারিন কিংবা অন্য কোন চাইনিজে যেতে হবে। কাজল বলবে তার প্রিয় রঙের কোন শাড়ি পড়তে। রেষ্টুরেন্টের মৃদু আলোয় টাপুর হয়ে উঠবে মোহন এক রমনী। আচ্ছা, রমনযোগ্যা বলেই কি মেয়েদের নাম ‘রমনী’ হয়েছে? কিন্তু সে আজ আটপৌ্রে কোন রমনী হতে চায়না। সে চায় আজ তার উনিশ হোক। সে জানে কাজল কিছু না বললেও মনে মনে আশা করে থাকবে স্পেশাল গিফটের। বিয়ের পর থেকে টাপুর তার প্রতি জন্মদিনেই ঘুমোবার আগে কাজলকে স্পেশাল গিফট দেয়। প্রেডিক্টেবল সারপ্রাইজ। ধুর! এই সব বাৎসায়নের গল্প কী অন্য কাউকে বলা যায়! নিজদের বাৎসায়ন অন্য কারো শোনা নিষেধ। এমন কি সুদীপেরও। যদি হিংসা হয়! সেতো না ধর্মরক্ষিত ভিক্ষু, না কোন নপুংসক মহামানব। টাপুর জানে, এরকম গিফট পেতে কাজলের ভালোই লাগে। যার জন্মদিন সেই দেয় গিফট। কিন্তু অন্য দিন চাইলেও ভাগ্যে জোটেনা।
সব দিন হবেনা। ওগুলো শুধু স্পেশাল দিনের জন্য। প্রতিদিন হলেতো ডাল ভাত হয়ে যাবে। তার চেয়ে স্পেশাল দিনেই পাবে, বিরিয়ানীর মতো। প্রতিদিন খেলে বিরিয়ানীও ডাল ভাতের মতোই মনে হবে।
আহা, কাজল যদি খেজুর গাছের গল্পটা জানতো! যদি গাছি হতে চাইতো?
আজ টাপুরের জন্মদিন। পঁয়তালি­শ, পঁয়ত্রিশ নাকি পঁচিশ তা জেনে কাজ কী! মেয়েদের কী বয়স জিজ্ঞেস করতে আছে? ছেলেরা না হয় এক সময় আর ছেলে থাকেনা। মেয়েরা সব সময় মেয়েই থাকে। সুদীপতো তাই বলে। হয়তো তাই। যদিও এতো দিন ভেবে এসেছে উলটো।
ছেলেরা তাইলে এক সময় কী হয়ে যায়? মেয়ে?
নপুংসক।
ধুর! তুমি একটা ফাজিল।
ইউ আর এজ ওল্ড এজ ইউ ফিল। সত্যিইতো। টাপুর ফিলস লাইক নাইনটিন। সি ইজ নাইনটিন টু’ডে। সে নিজেকে অটো সাজেশন দেয়। কে বলেছে তার মেয়ে ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ে!
আজ টাপুরের জন্মদিন। সে আজ কৈশোর ছেড়ে আসা উনিশের মেয়ে। টিনের চালে আসুক আজ বিটোফেনের চিঠি। আজ সে টাপুর টুপুর বৃষ্টির শব্দে আনমনা হতে চায়। আজ তার কোন সারপ্রাইজ গিফট চাইনা। চাইনা হীরের আংটি কিংবা ম্যান্ডারিনের পার্টি। আজ তার সুদীপকে চাই। সুদীপের জন্য হলেও তার বয়স উনিশেই ধ্রুব হয়ে যাক। আহা, যদি এমন হতো!
সুদীপ, তুমি কোথায়? চলে এসো প্লিজ! আই ওয়ান্ট টুবি ইউর ডেট ট্রী টুডে। তুমিতো তাই চেয়েছো। খেজুর গাছ যেমন গাছির ঘড়ায় সারা রাত ধরে নিজেকে উগরে দেয় ফোঁটায় ফোঁটায় ঠিক সেই ভাবে উগরে দেবো। যদি চাও কর্ণফুলীও হতে পারি, খরস্রোতা। চলে এসো প্লিজ! জন্মদিনে আমি নিজেই প্রিয় মানুষদের গিফট দেই। তোমাকে দেবোনা? তোমার পাঠানো লবষ্টার আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তোমার জন্য তাই আরো বেশি স্পেশাল গিফট রেখেছি। তুমি এসেই দেখোনা। তোমার জন্য ফিরিয়ে এনেছি উনিশ বছর বয়স।
টাপুরের চোখ ভিজে যায়। আজ তার জন্মদিন।

লেখকঃ

আহমেদ শরীফ