ভালোবাসি তোমাকে

রত্মার সংসারে মানুষ বলতে ওরা দু’জনই। কিন্তু মনে হয় একান্নবর্তী পরিবার। আছে মিঠু, মিতু, তোয়া, তিয়া আর মিয়াউ যাকে মুন্নু বলে ইডাকে। সারাটি দিনই কাজকর্ম ছুটোছুটি লেগেই আছে। ওকে স্নান করানো, তাকে খাওয়ানো, তাদের ঘর পরিস্কার করানো। কাজের আর শেষ নেই। এর মাঝে যখন অবসর পায় রত্মা তখন চলে আড্ডা। ফোনেই চলে দিদি ভাই মানে আলোর সাথে আড্ডা। আলো বয়সে কিছুটা বড় রত্মা থেকে তবুও বন্ধুত্ব নিবিড় গাঢ়। নিত্যদিন কতবার যে ওদের মধ্যে কথা হয়। ওরা দুটিতে এক বেলা কথা না বললে ওদের পেটের ভাত হজম হয় না। এমনই হরিহর আত্মা। মাঝে একটি দিন দু’জনার দু’রকম ব্যস্ততায় কথাবলা হয় নি। হঠাৎ রাত দুপুরে ফোন রত্মার আতঙ্কিত গলায়। ও দিদি ভাই শোন, আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি। অন্যপাশ থেকে আলোর উচাটনগলা- কি করেছিস? বলবি তো। তাড়াতাড়ি বল। একটা দিনকথা হয় নি এর মাঝে কি এমন অঘটন ঘটে গেলো আলো মনে মনে ভাবছে। রত্মা চুপ করে থাকাতে আবার বলছে- রতœা আমার অস্থির লাগছে বল বোনটি আমার, বল।
– শোন, আমার মুন্নু সোনাটাকে নিয়ে আমি এখন হাসপাতালে। ওর একটা অপারেশন হয়েছে। রাতটা থাকতে হবে। ডাক্তার সাহেব বলেছেন।
– কিবলিস? কি অপারেশন? আমি আসবো নাকি?
– নানা দিদি ভাই তোমাকে আসতে হবে না। আশেকে বলেছি সেই আসছে। তুমি দোয়া করো। ভালোয় ভালোয় বাসায় ফিরতে পারি।
সারাটা রাত কেবল গোংরালো। কিছু? ব্লিডিং হয়েছে। কষ্টে একেবারে কুঁকড়ে আছে মুন্নুর শরীরটা। ফোনের রিসিভার ধরে বসেই আছে আলো। সব না শোনা পর্যন্ত শান্তি হচ্ছে না।
-জানো দিদি ভাই তোমাকে ভয়ে বলিনি। একটা অপরাধবোধ কাজ করছে মনের ভেতরে। এতো কষ্ট পেয়েছে মুন্নু তুমি চিন্তা করতে পারবে না। চুপ করে রইল কিছুক্ষণ রত্মা।
-বল, তারপর। কি করলি? কিসের অপরাধ?
-এখানে ডাক্তারগুলো মানুষ নয়। কিভাবে খচখচ করে ইনজেকশনটা দিল দিদি কি বলবো। অপারেশনটা করলো একেবারে তাচ্ছিল্য ভারে। একটু যত্ম নিয়ে কাজ করবে না। ব্যাথায় চিৎকার করতে লাগলো আমার মুন্নু সোনাটা। যমে মানুষেটা নাটানি। কি করুণ অবস্থা। তোমায় কি বলবো। একেবারে ভয় পেয়ে গেছি আমি।
এখান ও সাসপেন্স? বলছিস না কেনো কি করলি?
ধৈর্য্য ধর দিনি। তোমার কাছে কিছুদিন কিছু কথা গোপন করেছি। তাইবুঝিআজআমার এই অবস্থায় পড়তে হলো।
আবার বলতে আরম্ভ করলো রত্মা-
তোমাকে বলেছি না আজকাল বেশ দুষ্ট হয়ে উঠেছে মুন্নুটা। বলা নেই কওয়া নেই হুটহাট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। পাড়া বেড়াতে। কি যে বদমাশ হয়ে উঠেছিল। কোথায় যেত কার সাথে মেলামেশা করতো। ক’মাসবাদে বাদে চারটা করে বাচ্চা। কি যে মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম। আগেরগুলো লোকজনকে দিয়ে দিয়েছি। এবার ভাবলাম। এতোই যখন পরপুরুষের কাছে যাবার খায়েশ তবে লাইগেশন করিয়ে দেই। চড়ে বেড়াও।
রত্মার কথা শুনে একেবারে চিৎকার করে ওঠে আলো
-হায় আল­াহ এ কি কথা! মুন্নুর লাইগেশন করিয়ে দিলি?
-কি করবো বল দিদি ভাই? যদিও অমানবিক। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মানসিক যন্ত্রণা হচ্ছে।
– আমাকে জানানো প্রয়োজন মনে করিসনি? একটু বুদ্ধি পরামর্শ করা লাগে না?
– রাগ করো না দিদি ভাই। ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। সেদিন ওর চেক আপ করিয়ে গেছি। বছরে যে ইনজেকশনটা দেয় ওটাও দিয়ে এসেছি। ডাক্তার সাহেব বলেছেন কোন অসুবিধে হবে না। তাই আরকি। কালবাড়ি এসো কথা হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আলোর পাঁজর থেকে। ফোনটা রাখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। চুপচাপ বসে থাকে কতক্ষণ।
মুন্নুকে নিয়ে বাসায় ফিরলো রত্মা ও আশেক। গরম জলে ওকে গামুছিয়ে দেয়। ক্ষতস্থান পরিস্কার করে মলমলা গিয়ে দেয়। বারবার জিভ বের করেক্ষত স্থানটা চাটতে চেষ্টা করছে মুন্নু। ব্যান্ডেজ টেপ দিয়ে পুরোটা মুড়ে দেয় রত্মা। হটওয়াটার ব্যাগটা নিয়ে কিছুক্ষণ ছেক দিয়েদিল। পরিস্কার বিছানা ওর ওপর ওয়ালক্লথ বিছিয়ে মুন্নুকে ঘুমপাড়ানো চেষ্টা করলো। যত্মের কোন ত্রæটি করেনি রত্মা। কষ্টে ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে। চোখে জল। আদুরে গলায় কথা বলছে মুন্নুর সাথে- সোনা তোর কষ্ট হচ্ছে? আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি রে। ওরে আমার মনা। এখন একটু ঘুমুতে চেষ্টা কর। আমি তোর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
মুন্নু আদরে লেজ নেড়ে মায়ামায়া কণ্ঠে বলছে- মা-উ, মা-উ। আরো আদর নেবার বাহানায়। রত্মার দু’চোখ গড়িয়ে জল ফোটায় ফোটায় ওর গায়ে গিয়ে পড়ছে। মুন্নু ক্লান্ত চোখে চেয়ে আছে মায়ের দিকে। কখনও চোখ দুটো উজ্জ্বল আলোয় বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠে। কখনও নিভুনিভু কি যেনো বলতে চায় রত্মাকে।
রত্মা ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের জীবনের অপ্রাপ্তির নামতা কষতে বসে। নিজে আমি নিঃসন্তান তাই বুঝি ভাবছিস তোর সন্তান আমার পছন্দ না। আরো বোকাতানয়। তোর ভালোই আমি চেয়েছিলাম। তোর ভালোর জন্য করেছি। দেখিস না তোকে আমি কত ভালোবাসি। ঐ যে দুটো কাকাতুয়া, দুটা ময়না ওদেরকে কত ভালবাসি। দিনরাত তোদের সেবাযত্মেই আমার সময় কেটে যায়। আমার আর কে আছে বল তোরা ছাড়া?
-বড়বড় চোখ তুলে মুন্নু বলে- মা-উ, মা-উ, কেঁদো না মা-উ।
ঐদিক থেকে ময়নাটা বলেওঠে- ঠিক তো মুন্নুটা দুষ্টু। কেঁদো না মা- মা- তোমায় ভালোবাসি মা-মা।
তবুও রত্মার মনের মধ্যে হুল ফোটা যন্ত্রণা। নিঃসন্তান মা কি বোঝে না সন্তানের আকুতি কতটা। বুকটা চিরে ফালিফালি হয়ে যায় রত্মার। মুন্নু তীব্র জ্বালাময়ী দুটো চোখ ওকে তাড়া করে ফেরে। মুন্নু কি রত্মাকে অভিশাপ দিচ্ছে? মুন্নার তীব্র জ্বলজ্বলে বাতির মত -চোখে চোখ পড়তেই রত্মার বুকের ভেতরটা খাবলে ধরে। আর ওর দিকে তাকাতে পারে না। রত্মা সরেযায়। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
বিছানয় গিয়ে শুয়ে পড়ে। দুটোদিন একটু বিশ্রাম হয় নি। কষ্টে-ক্লান্তিতে-আতংকে শরীর মন অবসাদ। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম রত্মার দুচোখজুড়ে। রাত গড়িয়ে সকালের আভা ফোনেনি। খুব সকালেই জেগে যায় আশেক। এগিয়ে যায় মুন্নুর বিছানার কাছে। দেখে নিঃপ্রাণ মুন্নু জ্বলজ্বল তীব্র আলোয় দুটো চোখে তাকিয়ে আছে। সেই মুহুর্তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো- মৃদু কণ্ঠে মা-উ মা-উ …….।
হঠাৎ দুঃস্বপ্নে বিছানা ছেড়ে ওঠে রত্মা- ওর স্বামীর দিকে চোখ পড়তেই কিছু আঁচ করতে পেরে দৌড়ে যায় মুন্নুর বিছানার পাশে। সেই নিঃপ্রাণ দেহে জ্বালাময়ী দুটো চোখ রত্মাকে যেনো প্রশ্নবানে জর্জরিত করছে। রত্মার তীব্র আর্তনাদ- ওরে আমার সোনা ওরে আমার ল²ী। তুই আমায় ভুলে বুঝে অভিমান করে চলে গেলি? আমি বাঁচবো কি নিয়ে। মুন্নুর শরীর কোলে তুলে শোক বিলাপ।

লেখকঃ

তাহমিনা কোরাইশী