যোগ বিয়োগ

আশি^নের জোছনা রাতে ঘরের কোণে গাড়ি এসে থামে নিশ্চুপ। হর্ণ বাজে না। কিন্তু ইঞ্জিনের শব্দ ছড়ায় ইথারে। আভাস পেয়ে টানা দুয়ার মেলে বুড়ি নামে উঠানে। কেডা… গাড়ি কইরা আইলো কেডা?
আমি গো বুড়ি খালা, আমি। গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলেন মনির হোসেন। পলকেই বুড়ির চোখের সামনে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। কয় কি বেডায়? কওয়া নাই বার্তা নাই এম্নে আইসা হাজির? আমার নাতি নাতকর কই?
তারা আসে নাই। আমি একলা আইছি।
ভালা হইছে। আইসো বাজানÑ আইসো, ছেলের বউ, মদিনা
হেরা ভালা আছে নি?
হ।
ড্রাইভার বেডারে ডাকো।
সে চলে যাবে।
ক্যান?
আমাকে নামিয়ে দিতে এসেছে।
বাক্কা অইছে। অ বেডা তুমি তাইলে রাইতে থাকবা?
শুধু রাইতে না। আমি এখন থেকে আপনার সঙ্গে এই গ্রামেই থাকবো।
ওমা বেডায় এইডা কিতা কয়, সাততালা রাজ্য প্রসাদ বেবাক রাইখা এই মাডির ঘরে ক্যান?
মাটিই হলো খাটি বুড়ি খালা। জীবন দুদিনের।
বাজান এহন কি খাইবাÑ গুড়া মাছের ছালন আছে, খাইবা তুমি?
তাই তো চাই খালা।
তাইলে চাইরডা খাইয়া লও আগে পরে গপ সপ করুম নে। তোমার খালুর শইলে­ বিষ বেদনা। জোয়ান কালে করাতি কাম করতো না? মোডা মোডা গাছের গুড়ি হেছড়াইয়া সবকিছু নষ্ট কইরা আছে। শইল তো বেডা একটা মিশিন। তেল মবিল হইলো গিয়া খাওন পানি।
এরপর খিলখিল শব্দে হাসে বুড়ি। মাচান থেকে নামিয়ে আনে কাঁচের প্লেট। মনির হোসেন তার বাড়িওয়ালা। মনিরের মায়ের ছোট বেলার সই এই বুড়ি। আসল নাম আমেনা বেগম থাকলেও বুড়ি নামেই গ্রাম জুড়ে পরিচিতি। দাইয়ের কাজ করে। ঘরে বৃদ্ধ স্বামী। দুই মেয়ে স্বামীর ঘরে। বুড়া বুড়ি থাকে মনির হোসেনদের বাড়ির একটি মাটির ঘরে। ঘরটি সুন্দর। সাড়ে সাতাইশ হাত ঘর। পাটাতনে নিমকাঠ। মনির হোসেনের বাবা রায়েটের সময় হিন্দু পাড়া থেকে জামেনীর কাছ থেকে এই ঘর কিনেছিলেন দুই শত আশি টাকা দিয়ে। এখন হাতীর দাঁতের মতোই দামী তার প্রতিটি অংশ। দন্না বেচলেও বেচতে পারবে পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা।
টেংরা মাছের চরচরি দিয়ে ভাত খেতে দেয় বুড়ি মনির হোসেনকে। পানি ভর্তি গøাস আর চিলুমচি ধরে সামনে, ‘নেও বাজান অতি ধুও।’
মনির হোসেন বুড়ির কাছ থেকে গøাস নিয়ে হাত ধুয়ে ভাত খেতে শুরু করেন। প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই মনে হয় অনেক দিন পর মজার খাবার এলো বুঝি তার সামনে। শীতের দুপুরে খাদ সেচে মাছ ধরে বাড়ি এলে দাদী বকাবকি করে কল পাড় নিয়ে সাবান ঢলে গোসল করাতো। বকবক করে গালাগাল পারতো। কিন্তু দাদী যখন এভাবে চরচরি রান্না করে ভাত খেতে দিত তখন ভুলে যেত পেছনের সকল বকা ঝকা। আজও খেতে বসে মনে পড়লো ভোর বেলার মতো করে শৈশবের কথা। দাদীর চামড়া কোঁচকানো মুখের হাসি স্পষ্টই যেন দেখতে পেল আমাদের মনির হোসেন।
ঢাকা শহরে ছাত্রজীবন থেকেই বসবাস মনির হোসেনের। ্এখন বয়স সাতান্ন। সংসারে দুই মেয়ে আর এক পুত্র সন্তান। ছেলে বউ লাইজু বিমান চালক। ছেলে মেকানিক ইঞ্জিনিয়ার। নিজের আছে জাহাজের ব্যবসা। বন্ধু কামরানের মাধ্যমেই ব্যবসাপতি শুরু তার। বছর পনেরোর মধ্যেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান মনির হোসেন। জাহাজের ব্যবসায় হাত দেয়ার পর আরো যেন জৌলুস নামে বাণিজ্যে। তার আগে ছিল স্বর্ণের ব্যবসা। বেলা শেষে মনির হোসেন যোগ বিয়োগ করে বেছে নিলেন গ্রামের মাটির ঘর। সান-সওকত ভালো লাগল না তার। মন্ত্রী হবার একটা প্রচÐ ইচ্ছে গত দু’বছর ধরে তাকে পেয়ে বসেছিল। এখন আর সেই ইচ্ছেটাও নেই। শিক্ষা মন্ত্রী হবার খায়েস জেগেছিল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানোর জন্য।
বাজান তো মাশাল­াহ এক তরকারী দিয়াই অনেকগুলি ভাত খাইলা দুধ দিয়া চাইরডা ভাত দেই? খাটি গরুর দুধ বেডা। তোমার খালুর জন্যে রোজ করছি।
না গো খালা আর ভাত নিব না। আমার খাওয়া শেষ।
বুড়ি আবারও চিলুমচি এনে ধরে মনির হোসেনের সামনে। মনির হোসেন পানির গøাস হাতে নিয়ে বাইরে যান। উচড়ায় দাঁড়িয়েই হাত ধোন। চাঁদ তখন বাঁশ ঝাড়ের উপরে উঠে গেছে। আমগাছতলা থোকা থোকা জোছনার আলো পড়ে থাকতে দেখে নেমে যেতে ইচ্ছে করছে তার। সেটুকু সম্ভবত বুঝতে পারলেন বুড়ি। তিনি ডাক ছেড়ে বললেন, ‘বাজান তুমি গাছতলা বইতে চাইলে বহো আমি চিয়ার নিয়া আসি।’
নিয়া আসেন খালা।
মনির হোসেন আমতলায় চেয়ারে বসে সিগারেট ধরায়। সুখ শব্দটির সঙ্গে মেলায় বর্তমানকে। বড়ই মধুর ঠেকে সবটা। পেছন ফেরে তাকিয়ে সিটকে আসেন বর্তমানে। ওখানে কোন সুখ নেই। আছে জিৎ-পরাজিত। হিংসা বিদ্বেষ।
বাজান গো তোমারে খালি সুপারি দিয়া একটু পান দেই? বলল বুড়ি।
তুমি ত বেডা এহনতরী গেরামের মতোই কতা কও।
আর অন্যেরা দেখি কেমুন কইরা কইরা জানি কথা কয়।
সবাই তো আর এক রকম হয়না খালা!
আসলে সবাই কিন্তু একই মাটির তৈয়ার। এই মাটির ভিত্রেই হইবো কয়বর।
মনির হোসেন আর কথা বলে না। সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়ে কিঞ্চিৎ ফুসফুস শব্দে। স্ত্রী পুত্র কন্যার কথা এখন আর মনে পড়ছে না তার। মনে পড়ছে শৈশবের তপ্ত দুপুরে মুন্সী বাড়ির পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য। তারা মিয়া ফুলচান এবং লাইলী আপার কথাও মনে পড়ল।
লাইলী আপা যুদ্ধের সময় মারা গেছে। লোকে বলে পাঞ্জাবী সেনাবাহিনীর লোক ক্যাম্পে নাকি লাইলী আপাকে ধরে নিয়ে অত্যাচার নির্যাতনের পর গুলিবিদ্ধ করে মেরে ফেলেছে। লাইলী আপার মুখটা এখনও মনে করতে পারলো মনির হোসেন। গোলগাল মুখ। নাকের বাম পাশে সাশা। গায়ের রঙ ছিল পাকা শসার মতো। তারই ছোট বোন পারুলের সঙ্গে পরবর্তীতে মনির হোসেনের ভাব জমে ওঠে। বিয়েও করে শেষতক পারুলকে। নাগরিক পারুলকে গ্রাম্যময় করা যায় নি। গ্রামের কোনো কিছুই এখন আর টানে না পারুলকে। ইহ জগৎই তার কাছে মিছা।
চাঁদ মাথার উপরে উঠে আসে। তীর্যক তার আলো। আমাদের মনির হোসেন বসা থেকে উঠেন না। একটার পর আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকেন। সিগারেট পুড়ে ছাই হবার সঙ্গে সঙ্গে নিজের জীবনেরও একটি অংশকে মেলাতে পারেন যেন। সেই অংশেই বিচরণ তখন তার। এরই মধ্যে আবারও বুড়ি আসে চায়ের কাপ হাতে। বাজান তোমার খালুর জন্য রং চা বানাইতে হয় তো নেও তোমার জন্যও আনলাম। মিডা কম হইতে পারে। চিনি কম আছিল। কাইল ভোরেই দোহান থোন এক পা চিনি আইন্না নিমুনে।
মনির হোসেন কোনো কথা বলেন না। বুড়ির হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দেন। ঢোক গিলে বলেন, চিনি ঠিক আছে খালা, আমি মিষ্টি কম খাই।
ভালা অইছে বাপ তাইলে।
খালা আপনি ঘুমিয়ে পড়েন গিয়া।
তোমার জন্যেও বিছনা করছি বাজান। আইসো ঘুমাও। কাইল ভোরে কথা বলুম নে।
খালা…
বলো বাজান।
বাবার কথা কি আপনার মুনে আছে?
মনে থাকবো না কেন? আমরা তো তখন বালা ডাঙ্গর। বিয়ার লায়েক হই হই ভাব।
বাবারে কারা মেরেছিল?
কেউ কইতে পারে নাই বাপ। মুখে কালা কাপর বাইন্ধা আইসা গহীন রাইতে ঠুল­ুর ঠুল­ুর গুলি­ মাইরা খতম করছিল।
কেনো মারছিল?
তোমার বাপের কোন দোষ আছিল না। বেজায় ভালো মানুষ আছিল। আমরা হুনছি হিন্দুরার লগে রেষারেষি নিয়া নাকি মারছিল। তোমার বাপের আবার হিন্দুরার লগে ভাব আছিল ভালো।
মনির হোসেন এবার এক চুমুকে চা শেষ করে খালি কাপ ফিরিয়ে দিল বুড়ির হাতে। বললো, খালা আপনি ঘুমান গিয়া আমি আসতেছি।
বুড়ি কাপ হাতে কি যেন বলতে বলতে চলে গেল ঘরের দিকে। মনির হোসেন আবারও সিগারেট ধরালেন। বাবার মুখটা মনে করবার চেষ্টা করেও পারলেন না। তার ছোট বেলায় বাবা খুন হয়েছেন। সেসব তার মানে থাকবার কথাও নয়। তবে বাবা যে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় মারা গেছে তা বুঝতে পারলেন। মুসলমান হয়ে হিন্দুর পক্ষে পা ফেলেছিল বাবা?
এখানেও যোগ বিয়োগ মেলে না। ভাবনার সঙ্গে আবহাওয়া মেচ খায় না। অকারণে ঘুর্ণিবায়ু বয় না। সময় অসময় সবই মানুষ্য জগতে ধরা পড়ে নিজ নৈমিত্যে।
মনির হোসেনের স্ত্রী পারুল গেল বছর গত হল। ক্যান্সার ধরা পড়েছিল গলায়। চিকিৎসা চলেছিল অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি। মৃত্যুই তাকে আলিঙ্গন করল শেষতক। সেই থেকেই একা নিঃসঙ্গ আমাদের মনির হোসেন। সব থেকেও কিছুই যেন নেই। অত আদরের ছেলের বউ বললো, পায়ের স্যান্ডেলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়?
রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটলেও ঘুম ভাঙ্গেনি মনির হোসেনের। বুড়ি দোকান থেকে চিনি আনিয়ে গরম চা বানিয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু জাগছে না মনির হোসেন। বুড়ির স্বামী তখন সকালের রোদে পিঠ খুলে বসলো আমতলায় ডাকলো স্ত্রীকে। বৃড়ি এগিয়ে গেলেন স্বামীর কাছে। বলেন, বলল বুড়ি।
ছেড়ার বাপে কি রাগ সাক কইরা চইলা আইছে নাকি? জানতে চাইলো বৃদ্ধ। আমি কেমনে কমু? আমার লগে কি সেই সব নিয়া কথা হইছে নি?
পরবর্তীতে কথা হয় বুড়ির সঙ্গে। মনির হোসেন এখন থেকে গ্রামেই থাকবেন বলে জানায়। গ্রামের কিছু উদ্যোগী ছেলেকে ডেকে এনে ভিটাবাড়িতে স্কুল বানানোর কথা বলেন।
ইশকুল কেন বানাইবা বাজান? জানতে চায় বুড়ি। ম্লান হেসে মনির হোসেন বলেন, গ্রামের মানুষগুলোর উন্নতি করতে চাই খালা। মানুষের উন্নতির জন্য শিক্ষা দরকার। আমারার গেরামে কোন বিদ্যা শিক্ষার সুযোগ নাই। ভিন্ন গাঁয়ে যাইয়া পড়তে হয় বইলা অনেকেই পড়ালেহা করে না। আল­া আমারে অর্থ দিছে। সেই অর্থ আমি অনর্থক কাজে আর ব্যয় করতে চাই না। যোগ-বিয়োগ কইরা দেখলাম মনের মতো একটা স্কুল করতে চাইলে আমি পারবো। তাইলে কেন করবো না?
বুড়ি ছোট্ট শিশুর মতোই মনির হোসেনের মাথা ছুঁয়ে আদর করতে লাগলো। ভুলে গেল মনির হোসেন এখন আর শিশু নেই। তার ছেলেকে বিয়ে করিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে হয়তো তারও ছেলে মেয়ে হবে।
ভালোবাসা, আদর কখনো পুরনো হয় না। কখন যে কার উপর কার আদর ভালোবাসা গড়ায় সেই হিসাবও মানুষ কষতে পারে না। মানুষ্য জীবন অনেকটা মাঝি বিহীন কোষা নৌকার মতোই ভাসতে থাকে দীঘির জলে। বাতাসই কিনারে ঠেকায় তার গলুই। তা না হলে ঢাকার সান শওকত ফেলে গ্রামে ছুটে আসবেন কেন মনির হোসেন? কেনই বা খুড়তে শুরু করবেন শেকড়?
স্কুল ঘর তুলতে লোক লেগে যায় ভিটাবাড়িতে। দ্রæত গতিতে এগিয়ে চলে তার কাজ। টাকার জোরে অনেক কঠিন কাজও সহজেই হয়ে যেতে থাকে। পুকুর পাড়ে বসে আগামীর স্বপ্ন জাল বুনেন মনির হোসেন। তার সামনে তখন শুধুই স্কুল গড়ার স্বপ্ন। ভিটাবাড়ির পুরনো তালগাছটা কাটা পড়বে জানালে সেটিকে কাটতে দেয় না মনির হোসেন। গাছটির সঙ্গে জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পারুল তখন ফ্রগ পরতো। এই তালগাছটি ছিল ছোট। আকারে পারুলের সমান উঁচু। ঐ তালচাড়ার চক্কার ফাঁকেই প্রেমের চিঠি লিখে রেখে যেত পারুল। সুযোগ বুঝে সেই চিঠি সংগ্রহ করে পড়তেন মনির হোসেন। উত্তরও পাঠাতেন একই পদ্ধতিতে। কালের স্বাক্ষী তালগাছটা আর কাটতে দিলেন না মনির হোসেন। বরং তার চার পাশে দুই ফুট দূর দিয়ে ইটের দেয়াল ঘেরাও করলেন। সেই কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর মনির হোসেন এলো তালগাছের কাছে। হাত দিয়ে ছুঁইলেন গাছটিকে। চোখ বুঝলেন। সর সর শব্দে তাল পাতা কাঁপিয়ে বাতাস বইলো তখন।
শুক্রবার সকালে চারটি গাড়ি ঢুকলো মনির হোসেনের গ্রামের বাড়িতে। স্কুল ঘরের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছিলেন তখন মনির হোসেন। খবর পেয়ে বাড়ি গিয়ে দেখেন ছেলে-মেয়ে এবং ছেলের বউ এসেছে মনির হোসেনকে শহরে নিয়ে যেতে। মনির হোসেন তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ ঘোরালেন নুয়ে পড়া লজ্জাবতি পাতার মতো করে। অস্ফুটে বললেন, ‘যাব না আমি তোমাদের শহরে। এখানে আমার জন্ম। জীবনবসান হবে এখানেই। মাটির কবর হবে আমার আসল ঠিকানা।’
তারপর স্যান্ডেল খুলে রেখে খালি পায়ে এগিয়ে গেলেন তিনি সামনের দিকে। পেছন থেকে ছেলে মেয়েরা ডাকলেও ফিরলেন না মনির হোসেন। ভিটাবাড়ির স্কুল ঘরের টিনে রোদ পড়ে তখন চিকচিক করছিল।

লেখকঃ

কণা রেজা