শত রঙে শতরঞ্জি বুনে স্বাবলম্বী রংপুরের নারীরা

আমি পারি, শতরঞ্জি বুনে আমার সন্তানদের লেখাপড়া আর সংসারের খরচ যোগানে স্বামীকে সহায়তা করতে আর তাই তো শত রঙে শতরঞ্জি বুনতে কোন ক্লান্তি নেই। এভাবেই শতরঞ্জি বুনতে বুনতে কথা গুলো বলছিলেন রংপুরের নিসবেত গঞ্জের একটি কারখানার শ্রমিক নার্গিস। নার্গিস ১৫ বছর ধরে শতরঞ্জি বুননের কাজ করছে। আগে নিজ বাড়িতেই করতেন, গত ৪ বছর ধরে নিসবেত গঞ্জের ওই কারখানায় চাকরি করছেন। নারগিস জানান বাড়িতে কাজ করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হত, টানা তৈরি করা, সুতা লাগানোসহ আরোও নানান জিনিসের যোগান দিতে হিমশিম খেতে হত এরপর শতরঞ্জি বুনে তা কারখানায় জমা দিতে হত। মালিক পক্ষ সেই শতরঞ্জি বুঝে নিয়ে প্রতি বর্গ ফুট ১০ টাকা দরে মূল্য পরিশোধ করত। এতে দিনে ১০ থেকে ১২ ফুটের একটি শতরঞ্জি বুনে আয় হত ১০০ থেকে ১২০ টাকা আর এখন কারখানায় কাজ করে মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। পরিবারের ২ জন অথবা ৩ জন কাজ করলে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়। নার্গিসের স্বামী খাইরুজ্জামান পেশায় একজন কার ড্রাইভার। ২ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে এক ছেলে কলেজে ও এক মেয়ে স্কুলে পড়ে, আর একছেলে মোটর গ্যারেজে কাজ করে। নারগিস বলেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে

শতরঞ্জির এই কাজের আয় তার পরিবারে অনেকাংশে স্বচ্ছলতা এনে দিয়েছে। নারগিসের মত ওই কারখানায় এলাকার রাজিয়া, খোরশেদা আক্তার, আতিফা, জাহানারা, আম্বিয়া, নিতুন জিরা, ফাতেমা, রঞ্জিনা, ঝুমাসহ ২৫ জন শ্রমিক শতরঞ্জির কাজ করে তাদের জিবিকা র্নিবাহ করছেন। তাদের বাড়তি আয়ে সন্তানদের ভবিষ্যত নিশ্চিত হচ্ছে। নিসবেত গঞ্জে ৫টি কারখানায় শতরঞ্জি বুনন কাজে কাজ করছে দেড় শতাধিক নারী শ্রমিক। শুধু তাই নয় ঐতিহ্যবাহী এই শতরঞ্জি রংপুর জেলা ব্রান্ডিং হয়েছে রং-বেরঙের সুতার এ গালিচা দিয়ে। যার মাধ্যমে উত্তরের এ জেলাকে আলাদাভাবে চিনিয়েছে দেশ-বিদেশে। কোন প্রকার যান্ত্রিক ব্যবহার ছাড়াই কাঠের ফ্রেম আর রশি দিয়ে সুতা গণনা করে হাত দিয়ে বাহারী নকশা করে তৈরি হয় শতরঞ্জি। নগরীর নিসবেতগঞ্জ এলাকায় ৫টি কারখানায় শতরঞ্জি বুনা হয়। পুরুষের তুলনায় বেশির ভাগ নারী শ্রমিকরাই এ শতরঞ্জি বুননের কাজ করেন। সকাল ৯টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫টা-৬টা পর্যন্ত শ্রমিকদের শতরঞ্জি বুননের শব্দে মুখরিত থাকে ওই এলাকা। নিসবেতগঞ্জের শতরঞ্জি পল­ীতে কথা হয় কারখানার মালিক মানিক মিয়ার সাথে। তিনি জানান, সকাল ৯টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা শতরঞ্জি বুনেন। প্রতি ফিট বুননে তাদেরকে মজুরী দেয়া হয় ১০ থেকে ১২টাকা। দিনে একেক জন শ্রমিক ১০ থেকে ১৫ ফুট শতরঞ্জি বুনতে পারেন শ্রমিকরা। তাদের এই উপার্জিত অর্থ দিয়েই চলে সংসার চালানো, সন্তানের লেখাপড়ার খরচসহ জীবন মান উন্নয়নের নানা কাজ। ঘরে বসে অলস সময় পার করা নারীরা তাদের শ্রম দিয়ে শতরঞ্জি বুনে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। শতরঞ্জি শ্রমিক আরজিনা বলেন, আমি দীর্ঘ ৭ বছর ধরে শতরঞ্জি বুনছি।
আমার স্বামী রিক্সা চালক হওয়ায় তার স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যেত। বর্তমানে আমি এ কাজে নিয়োজিত থাকায় আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারে যোগ করে স্বচ্ছলতা এসেছে। ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছি। তিনি আরো জানান, শতরঞ্জির চাহিদা বেশি থাকলে তার স্বামী ও ছেলেও বুননে সহযোগিতা করেন।
শতরঞ্জির চাহিদার কথা জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, তাদের বোনা বাহারী রঙের এই শতরঞ্জি দেশের বড় বড় শপিংমলসহ বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। সারা বছরই এর চাহিদা ব্যাপক। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে মানুষ শতরঞ্জি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা কিংবা বিশেষ ব্যক্তিরা আসলে তারা একবার হলেও এ শতরঞ্জি পল­ী ঘুরে দেখে শতরঞ্জি কিনে নিয়ে যান। অনেকে ওয়ালমেট বানিয়ে দেয়ালে ঝোলান। অনেকে উপঢৌকন হিসেবে প্রিয়জনকে উপহার দেন এই শতরঞ্জি। তারা আরো বলেন, মূলত শীতে শতরঞ্জির চাহিদা বেড়ে যায়। সৌখিন মানুষেরা ফ্লোরে বিছানোর জন্য শতরঞ্জি কিনেন। এছাড়া বিদেশ থেকে অর্ডার আসলে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা বেশ বেড়ে যাওয়ার কথাও জানান নারী শ্রমিকরা।
-মেরিনা লাভলী, রংপুর

লেখকঃ

সম্পাদক